ডেস্ক রিপোর্টঃ নবীগঞ্জে প্রেমিকার ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে ঘরের বাহিরে গেলে সংখ্যালঘু পরিবারের কিশোরীকে (১৬) জোরপূর্বক তুলে নিয়ে রাতভর গণধর্ষণ করেছে একদল দুর্বৃত্তরা। পরদিন সকালে পরিত্যক্ত জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নবীগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকা খরিয়া গ্রামে আতংক দেখা দিয়েছে।

ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে ভোররাতে তাকে রাস্তায় ফেলে যায় বলে জানা গেছে। সারদিন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও মাতব্বরগণ সালিশে বিষয়টি নিস্পত্তি করার জন্য ধর্ষিতাকে চাপ প্রয়োগ করেন। পুলিশ খবর পেয়ে বুধবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে ধর্ষিতাকে উদ্ধার করে নবীগঞ্জ থানায় মামলা করেন। বৃহস্পতিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ওই ভিকটিম কিশোরীকে ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

নবীগঞ্জ উপজেলার কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নের ইমামবাড়ি বাজার সংলগ্ন একটি ফিসারীর পরিত্যক্ত ঘরে গত মঙ্গলবার রাতভর তাকে ধর্ষণ করা হয়। কিশোরীর বাড়ি একই ইউনিয়নের খড়িয়া গ্রামে। এ ঘটনায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে প্রেমিকসহ আরো কয়েকজন সিএনজি চালকের নাম প্রকাশ করেছে ধর্ষণের শিকার কিশোরী। প্রেমিকের নাম স্বপন মিয়া (২৪)। সে ইমামবাড়ি বাজারের বাসিন্দা সাবেক মেম্বার সুন্দর মিয়ার পুত্র।

এ ঘটনায় কিশোরীর পিতা হিরানন্দ বাদী হয়ে প্রেমিক সিএনজি চালক ধর্ষক স্বপন মিয়া, দেবপাড়া গ্রামের হাজী মতিন মিয়ার ছেলে সিএনজি চালক মোশাহিদ মিয়া (২২) ও একই গ্রামের শমসু মিয়ার পুত্র সুমন (২০), পুরানগাও গ্রামের করিম মিয়ার পুত্র আব্দুল হামিদ এর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে নবীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিএনজি চালক স্বপন মিয়া ভিকটিম কিশোরীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করে। এ সম্পর্কের সুবাধে গত মঙ্গলবার রাত অনুমান ১০টার দিকে ফোন করে প্রেমিকা কিশোরীকে তার সাথে দেখা করতে ইমামবাড়ী বাজারে আসার জন্য বলে। সরল বিশ্বাসে প্রেমের টানে পিতা-মাতাকে না জানিয়ে লুকিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে ইমামবাড়ি বাজারে এসে প্রেমিক স্বপনের সাথে দেখা করে। এ সময় স্বপন তাকে ফুসলিয়ে ইমামবাড়ী বাজার সংলগ্ন মজুর খানের ফিশারীর পরিত্যক্ত একটি ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে স্বপনসহ আরো কয়েক লম্পট সিএনজি চালক মিলে কিশোরীকে রাতভর গণধর্ষণ করে।

গতকাল বুধবার ভোর রাতে কিশোরীকে স্থানীয় পুরানগাঁও গ্রামের মুছি বাড়ী সংলগ্ন স্থানে রেখে ধর্ষক লম্পটরা চলে যায়। পরে ধর্ষিতা কিশোরী ইমামবাড়ী বাজারে আসে। বিষয়টি জানাজানি হলে খবর পেয়ে ওসি (অপারেশন) উত্তম কুমার দাশের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ইমামবাড়ি বাজারে আসেন। পুলিশ কিশোরীর নিকট থেকে ঘটনা অবহিত হয়ে তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল মজুর খানের ফিশারী পরিদর্শন করেন। পরে কিশোরীকে নবীগঞ্জ থানায় নিয়ে আসেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষিতা যুবতী ঘটনার বিস্তারিত বিবরণসহ ধর্ষকদের নাম প্রকাশ করে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, কয়েকজনের একদল লোক মেয়েটিকে ধর্ষক করে পুরানগাঁও মুছি বাড়ি সংলগ্ন স্থানে ফেলে যায়।

নবীগঞ্জ থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ শেখ মো. সোহেল রানা জানান, ভিকটিম কিশোরীকে ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। ধর্ষকদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ ধরণের ঘটনা ওই এলাকায় ইতোপূর্বে কখনও ঘটেনি বলে উল্লেখ করে ধর্ষকদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন মহল।

মামলার অভিযোগ সূত্রে জানাযায়, নবীগঞ্জ উপজেলার ১২ নম্বর কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নের খরিয়া গ্রামের নিরানন্দ সরকারের যুবতি কন্যা গত মঙ্গলবার রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘরের বাহিরে গেলে পূর্ব থেকে ওৎপেতে থাকা একই ইউনিয়নের পুরানগাঁওয়ের করিম মিয়ার পুত্র হামিদ মিয়া, দেবপাড়া গ্রামের আবউল মতিনের পুত্র মোশাহিদ মিয়া, সমসু মিয়ার পুত্র সুমন মিয়া, লহরজপুর গ্রামের সুন্দর মিয়ার পুত্র স্বপন মিয়া গংরা তাকে জোড়পূর্বক তুলে নিয়ে পাশ্ববর্তী পরিত্যক্ত ঘরে মধ্যযুগীয় কায়দায় রাতভর উপর্যুপরি ধর্ষণ করে। বাড়ির রোকজন তাকে আশেপাশে অনেক খুঁজাখুঁজি করে বুধবার সকালে পার্শ্ববর্তী মুচির পরিত্যক্ত ঘর থেকে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। খবর পেয়ে নবীগঞ্জ থানার ওসি তদন্ত উত্তম কুমার দাশ ও এস আই পার্থ চক্রবর্ত্তীর নেতৃত্বে একদল পুলিশ ভিকটিমকে উদ্ধার করে নবীগঞ্জ থানায় এনে ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য হবিগঞ্জ আধুনিক হাসপাতালে প্রেরণ করেন।

ভিকটিমের পিতা নিরানন্দ সরকার বাদী হয়ে উল্লেখিত ঘটনাকারীদের বিরুদ্ধে নবীগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। ভিকটিমের পক্ষের লোকজন বিষয়টি নবীগঞ্জ উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমার পাল হিমেলকে অবগত করলে তাৎক্ষণিকভাবে নবীগঞ্জ উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুখেন্দু রায় বাবুল, সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু দাশ রানা, পৌর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য গৌরমনি সরকার, উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের দপ্তর সম্পাদক অমলেন্দু সুত্রধর, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পিন্টু রায়, সদস্য রাজীব কুমার রায়, কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়ন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক পরিমল সরকার, হরি সরকারসহ নেতৃবৃন্দ।

নবীগঞ্জ থানায় গেলে সেখানে অবস্থানরত নবীগঞ্জ বাহুবল সার্কেল এএসপি পারভেজ আলম চৌধুরীর এবং নবাগত ওসি শেখ মোহাম্মদ সোহেল রানার নিকট ঘটনার সাথে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির আহবান জানালে এএসপি সার্কেল উপস্থিত নেতৃবৃন্দকে সুষ্ঠু বিচারের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার করলে নিরীহ লোকজন ন্যায় বিচার পাবে।

এ ব্যাপারে ওসি (অপারেশন) উত্তম কুমার দাশ জানান, ভিকটিকমকে উদ্ধার করে ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য হবিগঞ্জ আধনিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার পর পরই আসামি পক্ষের লোকজন ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে বাদী পক্ষের লোকজনকে থানায় অভিযোগ দায়ের না করার জন্য হুমকি প্রদান করেছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় খরিয়া গ্রামের সংখ্যালঘু লোকজনের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।