কুমিল্লার তিতাসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্য

হালিম সৈকতঃ কুমিল্লার তিতাসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা যায় ১৯টি পদের সব কটিতেই অনিয়ম হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এমপি আমির হোসেনের প্রতিনিধি কড়িকান্দি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন এমপির বরাত দিয়ে এই নিয়োগ বাণিজ্যের টাকা প্রার্থীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন। জানা যায় প্রতিটি পদের জন্য ২ লক্ষ টাকা থেকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছে চাকুরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে।

একটি পদের জন্য একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। যিনি বেশি টাকা দিয়েছেন তিনি চাকুরি পেয়েছেন। যারা চাকুরি পান নি, তারা টাকা ফেরত দানের জন্য চাপ দিলে দেম দিচ্ছি বলছেন।

বিশ্বস্থ সুত্র থেকে জানা যায়, ইউসূফপুর গ্রামের এমপির এক বান্ধবী সাতানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৩ লক্ষ টাকা নিয়েছে। ওমরপুরের আল-আমিন এমপির বোন জামাই এবাদুলের হাতে দিয়েছে ৩ লক্ষ টাকা। চর রাজাপুরের কাদির এবং তফাজ্জল দিয়েছে আড়াই লক্ষ টাকা করে মোশাররফ চেয়ারম্যানের কাছে। বাগাইরামপুরের মোকলেসুর মোবারক মেম্বারের মাধ্যমে দিয়েছে ৩ লক্ষ টাকা, ইউসূফপুরের রাসেল সিকদার ৩ লক্ষ টাকা, বিএনপি নেতা আলাউদ্দিনের মাধ্যমে নয়াকান্দির শেখ ফরিদ দিয়েছে ২ লক্ষ টাকা, মজিদপুরের মোবারক আর দুধঘাটার জহিরুল হক ২ লক্ষ টাকা করে দিয়েছে মোশাররফ চেয়ারম্যানের কাছে, ভিটিকান্দির ফাহাদ আড়াই লক্ষ টাকা দিয়েছে যুব সংহতির শেখ ফরিদের মাধ্যমে। উল্লেখ্য এই ফাহাদের সকল কাগজপত্র ভূয়া। বহু টাকার বিনিময়ে সে কাগজপত্র তৈরি করে জমা দিয়েছে। ২০১৮ সালে কালাচানকান্দি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষা দিয়েছে। যাহার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৫১৮৬৬৩৫৭৫। দাসকান্দির সোহাগ এবং কাশিপুরের সজল হোসাইন দিপু দিয়েছে আড়াই লক্ষ টাকা করে যুব সংহতির শেখ ফরিদের মাধ্যমে। মানিককান্দির শান্ত সে দিয়েছে মোট সাড়ে তিন লক্ষ টাকা। এর মধ্যে সে যুব সংহতির শেখ ফরিদকে দিয়েছে ৫০ হাজার, আওয়ামী লীগের ফেইসবুক নেতা মাজহারুলকে দিয়েছে ১ লক্ষ টাকা এবং এমপি’র প্রতিনিধিকে দিয়েছে ২ লক্ষ টাকা। গোপনসূত্রে জানা যায় এই শান্তর সব সার্টিফিকেট জাল-ভূয়া এবং ইসলামাবাদের বায়েজিদের কাছ থেকে মোশাররফ চেয়ারম্যান নিয়েছে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা যারা জড়িত তারা হলো কুমিল্লা-২ আসনের এমপি আলহাজ¦ আমির হোসেন ভূইয়ার প্রতিনিধি কড়িকান্দি সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন, জাতীয়পার্টি যুব সংহতির তিতাস উপজেলা সভাপতি শেখ ফরিদ মুন্সী, বিএনপি নেতা আলাউদ্দিন মোল্লা, এমপির শালা বিএনপি নেতা মাহবুব আলম, এমপির পিএস মনির হোসেন এবং এমপির ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সাহিদা। এলাকায় চাউর আছে এমপির শালা প্রভাব খাটিয়ে এলাকার বিদ্যুতের যত কাজ আছে সে করছে এবং বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেছে। সে তিতাসের বিদ্যুৎ মন্ত্রী হিসেবে সর্বত্র পরিচিত।

নিয়োগে অনিয়ম বিষয়ে কড়িকান্দি সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বলেন, আমার কাছে কেউ কোন টাকা পয়সা দেয়নি। তবে অন্য কারো মাধ্যমে লেনদেন হতে পারে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না যে অনিয়ম হয়নি।

তিতাস উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবদুল আউয়ালকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কোন অর্থ লেনদেন হয়েছে কিনা আমার জানা নাই। এবং আমি এর সাথে জড়িত নই।

ভিটিকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকুরি প্রত্যাশী প্রার্থী (যার চাকুরি হয়নি) সোহেল রানা অভিযোগ করে বলেন, ভাই জেনুইন কাগজপত্র নিয়ে চাকুরি পাই নি কিন্তু ভূয়া কাগজপত্র দিয়া চাকুরি পায়। এর থেকে বড় দুঃখ আর কি হতে পারে।

সোহেল আরও বলেন, ভিটিকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরি হয়েছে ফাহাদ নামে একজনের তার সব কাগজপত্র ভূয়া। সে এই বছর কালাচাঁনকান্দি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষা দিয়েছে। তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর হচ্ছেঃ ১৫১৮৬৬৩৫৭৫

সে অন্য একটি স্কুল থেকে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে জমা দিয়েছে। কালাচাঁনকান্দি মাদ্রাসায় গেলেই সব তথ্য বের হয়ে আসবে।

কালাচাঁনকান্দি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক স্বীকার করেছেন যে ফাহাদ কালাচাঁনকান্দি মাদ্রাসার হয়ে দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে এবং ফল প্রত্যাশী।

নিয়োগ কমিটির সভাপতি তিতাস উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন বলেন, দেখেন আমার হাতে ছিল ,মাত্র ২০ নম্বর বাকি নম্বর গুলো ছিল অন্যান্য সদস্যদের হাতে। কেউ যদি কারো প্রতি সহানুভূতি দেখায় সেখানে আমার করার কি আছে বলেন? ভূয়া কাগজপত্র বিষয়ে কেউ যদি লিখিত অভিযোগ করে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নিয়োগ কমিটিতে ছিলেন সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন, সদস্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবদুল আউয়াল, এমপির প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন কড়িকান্দি সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন, তিতাস উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সভাপতি মো. সালাউদ্দিন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন তার ভাতিজা মাজহারুল সরকার, স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক এবং এসএমসির সভাপতিগণ। গত ২৫ এপ্রিল এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

নিয়োগ বঞ্চিত এবং সুশীল সমাজের দাবী দুদক, জেলা প্রশাসকসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দোষীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি প্রদান করা হোক। অন্যথায় এই নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ হবে না। ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হতে পারে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ