কুমিল্লার সফল নারী উদ্যোক্তা সেলিমা আহমাদ

ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লার কৃতি সন্তান, বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত সেলিমা আহমাদ। ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল সাংবাদিক বা আর্টিস্ট হওয়ার। হলেন ব্যবসায়ী। সফল হয়েছেন এই পেশায়। সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস। বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিডব্লিউসিসিআই) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। নিটল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করছেন সেলিমা আহমাদ। এবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দেয়া কর বাহাদুর পরিবার সম্মাননা পেয়েছে তার পরিবার।

ব্যবসায়ীদের নোবেল হিসেবে খ্যাত সম্মানজনক পুরস্কার অসলো ‘বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশে প্রথম কোনো নারী এই পুরস্কার পেলেন। এশিয়া মহাদেশে প্রথম মুসলিম নারী হিসেবেও তিনি এই পুরস্কার পেয়েছেন। ব্যবসার সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

সেলিমা আহমাদের ছোটবেলা কাটে খুলনায়। খুলনার ফাতেমা হাইস্কুল থেকে ১৯৭৫ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকার হলিক্রস কলেজ থেকে ১৯৭৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরপরই তার বিয়ে হয় আবদুুল মাতলুব আহমাদের (নিটোল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান) সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে বি.কম (সম্মান) এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই বড় ছেলে আবদুল মুসাব্বির আহমাদ নিটলের জন্ম হয়। সেলিমা আহমাদ ছাত্রাবস্থায়ই সংসার-সন্তান লালনপালনের সঙ্গে সঙ্গে হ্যান্ডিক্রাফট রপ্তানির মাধ্যমে তার বিজনেস শুরু করেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের তৈরি নানা রকম প্রয়োজনীয় সব উৎপাদিত পণ্য দেশে-বিদেশে সম্মান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে সহায়তা করছে আজো। সারা দেশে তার কর্মীবাহিনীর সংখ্যা হাজার হাজার। যারা নিজেরাও আজ স্বাবলম্বী।

একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৮০’র দশকে আমি যখন ব্যবসা শুরু করি তখন একজন নারীর জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়া অনেক বেশি সমস্যা ছিল। নারীকে ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে তখনো সমাজ অভ্যস্ত ছিল না। কিন্তু আজকে উদ্যোক্তারা নিজ কর্মক্ষেত্রে, ব্যাংকে, এয়ারপোর্ট এসব জায়গায় গেলে তেমন বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় না।

তিনি বলেন, নারীর অগ্রগতির জন্য নারী সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন। নারী উদ্যোক্তারা অনেক পণ্য উৎপাদন করছেন কিন্তু বাজার ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারছেন না। এসব ব্যাপারে সরকারি সহযোগিতা দরকার, পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের স্বার্থে আরো প্রতিষ্ঠান হওয়া দরকার।

১৯৮২ সালে মাত্র ১ লাখ টাকা পুঁজি দিয়ে ৫ বন্ধু মিলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ শুরু করেন। উদ্যোক্তারা কীভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে পারেন সেই ধরনের পরামর্শই দিতেন তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে। ২ বছর এ কাজ করার পর অন্য বন্ধুরা ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে চলে যান। তখন তিনি একা হয়ে যান। ’৮৪ সালে তার স্বামী ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের বর্তমান সভাপতি মাতলুব আহমাদ ভারত থেকে গাড়ি আমদানি করতেন। তখন তার সঙ্গে কাজ শুরু করেন। মাতলুব আহমাদ গাড়ি আমদানি করতেন আর তিনি সেগুলো বিক্রি করতেন। এ প্রতিষ্ঠানে ২ জন কর্মচারী আর তারা স্বামী-স্ত্রী ২ জন মিলে মোট ৪ জনে কাজ করতেন। তিনি গাড়ি বিক্রির কাজ করতেন। আর মাতলুব আহমাদ বাইরের দিক সামাল দিতেন। এভাবে চলছিল শুরুর দিকের আজকের দেশের বিখ্যাত শিল্প গ্রুপ নিলয় নিটল গ্রুপের কার্যক্রম।

নিজে আলাদা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার গল্পে সেলিমা আহমেদ বলেন, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম কৃত্রিম ফুল প্রস্তুত ও রপ্তানি করার লক্ষ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে ২০০ নারী নিয়ে কারখানা গড়ে তোলেন। সেখানে পুঁজি ছিল ৭০ লাখ টাকা। তখন ব্যাংক ঋণ পেতে অনেক সমস্যা হয়েছে। নারী বলে কেউ ঋণ দিতেন না। যখন কারখানা শুরু করেন তখন শুল্ক অফিসে গেলে তারা দ্বিধায় ছিল ব্যবসা করতে পারব কিনা। ব্যাংকাররা মনে করতেন নারীরা ব্যবসা বোঝে না, তাই ঋণ দিতে চাইতেন না। পণ্য রপ্তানি করার জন্য বিভিন্ন বাণিজ্য মেলায় যেতে হয়েছে। সেখানে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন নারী দেখে। কটূক্তিও করেছেন। তারপরও ব্যবসা থেকে পিছিয়ে যাইনি।

সফল নারী হিসেবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ে ১৯৯৮ সালে পরিচালক পদে নির্বাচিত হন সেলিমা আহমেদ। এরপর ২০০০ সালে একই পদে নির্বাচনে জয়ী হয়েও বেশিদিন থাকতে পারেননি। পরিস্থিতি নেতিবাচক হওয়ায় পদত্যাগ করেছিলেন।

দিল্লিতে নারী উদ্যোক্তা সম্মেলনে যোগদানের পর তার ধ্যান-ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ২৪ জন নারী নিয়ে দেশে গঠন করেন উইমেন চেম্বার। তখন এফবিসিসিআই বাধা দেয়। সরকার ২০০১ সালের ২০ জুন উইমেন চেম্বার করার অনুমোদন দেয়। ৯ বছর এফবিসিসিআই এর নিবন্ধন দেয়নি। এমনকি বারবার বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়। লাইসেন্স পেতে প্রতিদিন মন্ত্রণালয়ে দৌড়াতে হয়েছে। কিন্তু সরকার স্থায়ী লাইসেন্স দেয়নি। অস্থায়ী লাইসেন্স দেয় যা প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়েছে। এরপর আদালতের মাধ্যমে লাইসেন্স পান। তারপর নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ শুরু করেন।