কুমিল্লা তিতাস, যেন এক খুনের জনপদ

ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লা জেলা সদর থেকে ৫৮ কি.মি পশ্চিম-উত্তরে গোমতী, তিতাস ও কাঠালিয়া নদীবেষ্টিত ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত তিতাস উপজেলা। ১০৭.১৯ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট প্রায় পৌনে ৩ লক্ষাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ উপজেলাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নেতৃত্বের কোন্দলে রাজনীতিবিদদের জন্য যেন এক রক্তাক্ত ও ভয়াল জনপদে পরিণত হয়েছে। এ উপজেলায় খুনের আশংকায় রাজনীতিবিদরা থাকেন সর্বদা ভীত সন্ত্রস্ত।

রাজনৈতিক সহিংস কর্মকাণ্ডে জেলার অপর ১৬ উপজেলা থেকে এগিয়ে এ উপজেলাটি। রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি থেকে ছিচকে সন্ত্রাসী অনেকেরই হাতে রয়েছে বিদেশি রিভলভারসহ আধুনিকমানের যতসব অস্ত্র। আধিপত্য বজায় রাখতে তিতাসের ঘরে সংরক্ষণ করা হয় দেশী টেটা বল্মম, চাপতিসহ সকল দেশীয় অস্ত্র।

স্থানীয়দের মতে এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি, সিএনজি স্ট্যান্ড, বালু মহাল ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গত একযুগে এ উপজেলায় ৪ জন নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানসহ অন্তত দেড় ডজনেরও অধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও অন্যান্য কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে আরও শতাধিক।

থানা পুলিশ ও স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৪ সালের ৩০ মার্চ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপণে তিতাসকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হিসেবে ঘোষণার পর ৪ এপ্রিল এর গেজেট প্রকাশিত হয়। এক সময়ের উন্নয়ন বঞ্চিত এ এলাকার মানুষ একটি স্বতন্ত্র উপজেলা পেলেও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি ভুলতে পারেনি আজও। এখনও শান্তি ফিরে আসেনি তিতাস পাড়ের মানুষের। রাজনৈতিক হত্যা ও সহিসংস ঘটনা ছাড়াও ব্যক্তিগত কিংবা গোষ্ঠিগত বিরোধেও কখনও কখনও শুরু হয় টেটাযুদ্ধ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিতাস থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কে কখন খুন হয়ে যান এই ভয়ে সন্ধ্যার পর এলাকার লোকজন তেমন একটা রাস্তায় বের হয় না। উপজেলার প্রধান দাউদকান্দি-তিতাস-হোমনা সড়কটি সন্ধ্যার পরে চলে যায় ছিনতাইকারীদের দখলে। রাজনৈতিকভাবে তিতাসে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের জর্জরিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। হোমনা-তিতাস নিয়ে গঠিত এ সংসদীয় আসনের এমপি জাতীয় পার্টির আমির হোসেন। তাই অনেকটা অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রণহীন সেখানকার আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দিন ধরে কয়েকটি গ্রুপ ও উপ-গ্রুপে বিভক্ত।

তিতাস উপজেলার যাত্রা শুরুর আগেই ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে তিতাস উপজেলার জিয়ারকান্দিতে দলীয় কোন্দলের জের ধরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন মোল্লা। সেই থেকে আতংকের জনপদে রূপ নেয় এক সময়ের দাউদকান্দি ও বর্তমান তিতাস উপজেলা। এরপর বিভিন্ন সময় অনেকটা ‘ধারাবাহিকভাবে’ খুন হন জিয়ারকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের তিন চেয়ারম্যান।

১৯৯৮ সালে দলীয় কোন্দলে প্রতিপক্ষের হামলায় প্রাণ হারান তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান। এরপর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তার ছোট ভাই সফিকুল ইসলাম। কোন্দলের রোষাণলে তারও শেষ রক্ষা হয়নি। ২০১০ সালে বড় ভাইয়ের ন্যায় খুন হন চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম।

এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জের ধরে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর সকালে একদল সন্ত্রাসী তিতাস উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং জিয়ারকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান মনির হোসাইন সরকার ও তার শ্যালক মহিউদ্দিনকে প্রতিপক্ষরা পার্শ্ববর্তী গৌরিপুর বাজারে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে। ওই খুনের পাল্টা প্রতিশোধও নেয় মনির চেয়ারম্যানের সমর্থকরা। ওই জোড়া খুনের প্রায় ৬ মাস পর ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল দাউদকান্দির গৌরীপুর বাজারে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মনির চেয়ারম্যান হত্যা মামলার আসামী ও যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ আলী ও আবু সাইদকে হত্যা করা হয়।

বিগত ২০১৪ সালে তিতাস উপজেলার কলাকান্দির হাড়াইরকান্দি গ্রামে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বাহার ও ইব্রাহিম গ্রুপের মধ্যে সংর্ষের সময় টেটাবিদ্ধ হয়ে মারা যান বিএনপি কর্মী রেজাউল করিম সেন্টু। পরে ২০১৫ সালের ২২ মে রাতে ওই এলাকায় একই গ্রুপের সহিসংতার পর আওয়ামী লীগের সমর্থক শাহ আলমকে (৪৫) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

সর্বশেষ ২৪ মার্চ রাতে এলোপাতাড়ি গুলি করে আওয়ামী লীগ নেতা হাজী মোহাম্মদ মনির হোসেনকে (৫০) হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ওই দিন রাত ৯টায় উপজেলার ভাটিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় বসে আড্ডা দেয়ার সময় সন্ত্রাসীরা তার বুকে গুলি চালায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে নেয়ার পথে গাড়িতে মনির হোসেন মারা যান। তিনি জগতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।

১৯৯১ সালে নিহত আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন মোল্লার মেয়ে ও কুমিল্লা উত্তর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পারুল আক্তার জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগে কর্মীদের আগলে রাখার মতো বিচক্ষণতা নেতারা দেখাতে পারছেন না। ফলে নেতৃত্বের শূন্যতা, রাজনৈতিক কোন্দল, আধিপত্যের লড়াই এবং বিশেষ করে অভিভাবকহীন উপজেলা আওয়ামী লীগ স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত। আর এ রাজনৈতিক বিভাজন থেকে তৈরি হওয়া শত্রুতার কারণে কিছুদিন পর পর প্রাণহানি হচ্ছে। এর ফল ভোগ করে বিরোধী পক্ষ।

তিতাস উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার প্রসঙ্গে থানার ওসি মো. নুরুল আলম টিপু জানান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারীদের গ্রেফতারে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে থাকে।

এদিকে ২০১৭ সালে তিতাসের জিয়ারকান্দির ইউপি চেয়ারম্যান মনির সরকার হত্যাকাণ্ডসহ পৃথক দুটি জোড়া খুনের হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেফতার ও চার্জশিট প্রদানসহ তদন্তের অভিজ্ঞতা থেকে কুমিল্লা ডিবির এসআই শাহ কামাল আকন্দ জানান, তিতাস উপজেলা কুমিল্লা জেলার মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী উপজেলা। সেখানকার ব্যক্তিগত, দলীয়, আধিপত্য, গোষ্ঠিগত কিংবা আর্থিক বিরোধ নিরসনে স্থানীয়দের কেউই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসে না। তাই পুলিশের একার পক্ষে এসব বিরোধ নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: