কুমিল্লা বোর্ডের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারছে না এসএসসি পরীক্ষায়

ডেস্ক রিপোর্টঃ নিয়মিত শিক্ষার্থীসহ প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর বিশাল অংশ ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে শিক্ষার্থীকে অবশ্যই নির্বাচনী পরীক্ষায় সব বিষয়ে পাস করতে হবে, এক বিষয়েও ফেল করলে হবে না। এ নীতি নির্ধারণ করেছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

নির্বাচনী পরীক্ষার ফল অনুসরণ নীতির কারণে ওই সব শিক্ষার্থী এবাবের এসএসসি পরীক্ষার আসনে বসতে পারবে না। ফলে ওই শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। তবে দেশের কোনো শিক্ষা বোর্ডেই এ ধরনের নীতি নেই বলে কুমিল্লা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, ওই পরীক্ষার্থীদের মধ্যে এক বিষয়ে ফেলের সংখ্যাই বেশি। তাদের সুযোগ দিলে অর্ধলক্ষাধিক শিক্ষার্থী পাস করে বের হয়ে যেত।

বোর্ড সূত্র জানায়, গত বছর কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষাতেই ফল বিপর্যয়ের কারণে বিতর্কিত হন কুমিল্লা বোর্ডের চেয়ারম্যান, সচিব, কন্ট্রোলার, ডেপুটি কন্ট্রোলারগণসহ কর্মকর্তারা। তাদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। খোদ প্রধানমন্ত্রীও কুমিল্লা বোর্ডের ফল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সমালোচনার ঝড় বয় কুমিল্লাসহ সারাদেশে। বোর্ডের অদক্ষ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের দাবি ওঠে। এ দাবিতে ঝড় ওঠে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। এর ফলে শিক্ষার মান উন্নয়নে দফায় দফায় সভা করে মন্ত্রণালয় ও বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এরপর কুমিল্লা বোর্ড ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও কিছু অদক্ষ ও আনাড়ি কর্মকর্তার কারণে বারবার পিছিয়েছে। এবারের এ নির্বাচনী ফলনীতির কারণে পরীক্ষার আগেই শিক্ষার্থীদের ফেল করানো হয়েছে বলে মন্ত্রব্য করেন অনেকে।

এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে নির্বাচনী পরীক্ষাকে ভালো ফলের হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তবে সূত্র জানায় পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারাদের মধ্যে এক বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীই বেশি। যারা নির্বাচনী পরীক্ষায় দু-এক বিষয়ে ফেল করেছে তাদেরও এবার এসএসসি পরীক্ষার আসনে বসার সুযোগ দিচ্ছে না বোর্ড কর্তৃপক্ষ। ফলে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ৬ জেলায় নিয়মিত রেজিস্ট্রেশন করা ২ লাখ ১০ হাজার ৭৩৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম ফিলাপ করে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পেয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯৯ জন শিক্ষার্থী। নিয়মিতদের মধ্যেই বাদ পড়েছে ৭৪ হাজার ৬৩৮ জন। এবার বিগত বছরের অনিয়মিত পরীক্ষার্থী রয়েছে ৭৫ হাজারেরও বেশি। তাদের মধ্যে এবার ফরম ফিলাপ করেছে ৪৬ হাজার। এখানেও বাদ পড়েছে প্রায় ২৯ হাজার পরীক্ষার্থী। সব মিলিয়ে এক লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না কুমিল্লা বোর্ডে।

সূত্র জানায়, বোর্ড কর্তৃপক্ষ নিদের্শনা জারি করে সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানকে বলেছে, স্কুলে নির্বাচনী পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী এক বিষয়ে ফেল করলেও তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া বন্ধ রাখতে হবে। আর এর ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও বোর্ড কর্তৃপক্ষ হুঁশিয়ারি জারি করেছে। সেই সঙ্গে স্কুলের নির্বাচনী পরীক্ষার ফল উপজেলা নির্বাহী অফিসারে মাধ্যমে বোর্ডে পাঠানোরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এ সিদ্ধান্তকে কাজে লাগিয়ে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফরম ফিলাপে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছে। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বোর্ডকে না জানিয়ে দ্বিতীয়বার নির্বাচনী পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দিয়ে অর্থ আদায় করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এখন হরিলুটের কারবার শুরু করেছে। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য অভিভাবকরাও অতিরিক্ত টাকা এনে দিচ্ছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।

হঠাৎ করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ বোর্ডের অধীন স্কুলগুলোকে আগামী এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল বোর্ডে প্রেরণের নির্দেশ দেয়। পরবর্তী সময় বলা হয় যারা এক বা একাধিক পরীক্ষায় ফেল করেছে তাদের ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হবে না।

আর সব কিছুকে ছাপিয়ে এবার বোর্ড কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দিয়েছে ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের নির্বাচনী পরীক্ষার রেজাল্টশিট বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়ার জন্য। দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এ নির্দেশনার কারণ- যারা এক বা একাধিক পরীক্ষায় ফেল করেছে তাদের আগামী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেয়ার।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ না কারার শর্তে একটি সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেন, নির্বাচনী পরীক্ষা কখনো মাপকাঠি হতে পারে না। তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে- যারা এক বা দুই বিষয়ে ফেল করেছে এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা খুব ভালো ফল করেছে। অপর এক প্রধান শিক্ষক বলেন, বোর্ড এক অদ্ভুত নিয়ম করেছে। নির্বাচনী পরীক্ষার রেজাল্টশিট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। সেখান থেকে যাদের নাম দেয়া হবে তাদেরই পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতারা ফায়দা লুটছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে।

এ ব্যাপারে টিআইবি পরিচালিত সনাক কুমিল্লার সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, এক বা দুই বিষয়ে ফেল কোনো মাপকাঠি হতে পারে না। অনেক সময় দেখা গেছে এক/দ্ইু বিষয়ে ফেল করেও খুব ভালো ফল করেছে শিক্ষার্থীরা। এ পদ্ধতি বাস্তবসম্মত নয়। এটা শিক্ষার দ্বার রুদ্ধ করে দেবে। তিনি বলেন, প্রশাসন ও বোর্ড কুমিল্লা শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের চেষ্টা করছে। পিছিয়ে দিচ্ছে কুমিল্লা অঞ্চলের শিক্ষাকে।

এ ব্যাপারে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুদক এবং আমাদের মহাপরিচালকের নিদের্শ মতো কেবল যারা নির্বাচনী পরীক্ষায় সব বিষয়ে পাস করেছে তারাই এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে, অন্যদের সুযোগ দেয়া হবে না। তিনি বলেন, বিশাল সংখ্যার শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সম্ভাবনা থকলেও কিছুই করার নেই। সিদ্ধান্ত মেনেই আমাদের কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, কিছু পরীক্ষার্থী ঠিকমতো পড়াশোনা করে না। চূড়ান্ত পরীক্ষায় হলে গিয়ে নকলের আশ্রয় নেয়। তারাই ফেল করে বোর্ডের সুনাম ক্ষুণœ করছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার বিষয়ে তিনি বলেন, এমন কিছু অভিযোগ এবং আলামত পেয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।