কুমিল্লা মুরাদনগরে প্রধান শিক্ষক যখন দপ্তরী!

মুরাদনগর (কুমিল্লা) সংবাদদাতাঃ সকাল ১০টায় ঢুকতেই চোখে পরলো একজন ভদ্রলোক ঘন্টা বাজাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা ঘন্টার শব্দ শুনে ক্লাস রুমে ঢুকছে। কিন্তু চোখে পরছেনা কোন শিক্ষক। অপরদিকে যিনি স্কুলের ঘন্টা বাজাচ্ছেন তাকে দপ্তরীর মতো মনে হচ্ছেনা। মূহুর্তের মধ্যে মনে অনেক প্রশ্নের তৈরী হলো। স্কুলের ঘন্টা দপ্তরী বাজাবে সেটাই স্বাভাবিক আর শিক্ষক আছে হয়তো চোখে পরছে না। তাই মনে কোন প্রকার দ্বিধা না রেখে, ঘন্টা হাতে ব্যাক্তির কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম আপনাদের প্রধান শিক্ষক কোথায়। লোকটি বললেন আমার সাথে আসে, তিনি অফিস রোমে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে বললেন জি আমি প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দিন। এমনই ঘটনা ঘটছে কুমিল্লা মুরাদনগর উপজেলার কদমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দিন সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বলেন, বিদ্যালয় বিহিন এলাকায় বিদ্যালয় নির্মান প্রকল্পের আওতায় এ বিদ্যালটি স্থাপন করা হয়। কোন সহকারি শিক্ষক ও দপ্তরী না থাকায় যে কারনে বিদ্যালয়টি স্থপন করা হয়েছে তার কিছুই হচ্ছেনা। আমি নিজেই পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক ও দপ্তরীর কাজসহ স্কুলের সকল কাজ করতে হচ্ছে। প্রায় সময় দাপ্তরিক কাজে আমাকে উপজেলা সদরে সময় দিতে হয়। তখন বিদ্যালটি অভিভাবকহিন হয়ে থাকে। এত করে বর্তমানে স্কুলটিতে থাকা প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চরম ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন আমি কি প্রধান শিক্ষকের কাজ করবো? নাকি সহকারি শিক্ষকের ক্লাস নিবো? নাকি দপ্তরীর হয়ে স্কুলের ঘন্টা বাজাবো? অভিভাবকরাও প্রতিদিনেই শিক্ষক আনার জন্য আমাকে চাপ দিচ্ছে।

তেমনি রয়েছে চুলুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির অবস্থা। একটি মাত্র ক্লাস রোম নিয়ে চলে সেখানকার পাঠদান।
কেবল ওই বিদ্যালয় গুলোতে নয়, উপজেলার অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে। শিক্ষক সংকট প্রকট হওয়া ১৭টি বিদ্যালয়গুলোতে ৭৩টি সহকারি শিক্ষকের পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অর্ধশতটি পদ শূণ্য রয়েছে। বর্তমান সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও মোট জনসংখ্যার শতভাগ প্রাইমারী শিক্ষা নিশ্চিত করনের লক্ষ্যে কাজ করলেও সব দিকে পিছিয়ে রয়েছে এ উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো। পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজে বেশি সময় দিতে হচ্ছে শিক্ষকদের। একটি ক্লাসে শিক্ষক গেলে অন্য ক্লাসগুলো থাকে ফাঁকা। এতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম চরম ভাবে বিঘিœত হচ্ছে। সন্তানদের স্কুলে পাঠালেও ক্লাস না হওয়ায় সামনে বার্ষিক পরীক্ষা নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার চুলুড়িয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কদমতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪টি করে সহকারি শিক্ষকের পদ থাকলেও সবকয়টিই শূণ্য রয়েছে। ভাঙ্গানগর ৪টি সহকারি পদে আছে একজন, কাজিয়াতল দক্ষিনে ৮টি সহকারি পদে আছে ২ জন, কৈজুরী ৭টি সহকারি পদে আছে ২ জন, সাহেবনগরে ৪টি সহকারি পদে আছে ২ জন, নোয়াকান্দিতে ৪টি সহকারি পদে আছে ২ জন, দৌলতপুরে ৪টি সহকারি পদে আছে ২ জন, আন্দিকুটে ৯টি সহকারি পদে আছে ৬ জন, পাহাড়পুরে ৮টি সহকারি পদে আছে ৪ জন, কুরুন্ডিতে ৪টি সহকারি পদে আছে ২ জন, আলীরচর ৪টি সহকারি পদে আছে ৩ জন, লক্ষীপুরে ৪টি সহকারি পদে আছে ৩ জন ও নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫টি সহকারি পদের মধ্যে রয়েছে ৪ জন শিক্ষক রয়েছে।

অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয় গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট থাকলেও শিক্ষা অফিস কোনও প্রদক্ষেপ নিচ্ছে না। শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক অর্থবান অভিভাবক তাদের সন্তানদের উপজেলা সদরে নিয়েও পড়া লেখা করাচ্ছেন। অপরদিকে নি¤œ শ্রেনির অভিভাকরা তাদের সন্তানদের লেখা পড়া বন্ধ করে দিয়ে কাজে পাঠাচ্ছে।

কদমতলি স্কুলের মুজাহিদুল হাসান ও আলীনূর আক্তার বলে, তাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ছারা আর কোন শিক্ষক নেই। তিনি অফিস কাজ থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির সকল পাঠদান কাজ করতে হয়। তাই এটি শুধু নামে মাত্র স্কুল। স্কুলটি পরিচালনা করতে যেমন প্রধান শিক্ষকের হিমশিমে পরতে হচ্ছে তেমনি শিক্ষার্থীদের কোন লেখা-পড়া হচ্ছেনা।

কৈজুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিদ্যালয়টিতে ৫২৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে পড়াতে অন্তত ১০ জন শিক্ষক প্রয়োজন হলেও আছেন মাত্র দুই জন। বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজে আমি যখন ব্যাস্থ থাকি ওই সময় দুইজন শিক্ষককে একসঙ্গে তিনটি শ্রেণিতে পড়াতে হয়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক গাজীউল হক চৌধুরী বলেন, উপজেলা সদর থেকে তুলনামূলক দুর্গম এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় কোনো শিক্ষকই এখানে বেশি দিন থাকেন না। অপরদিকে প্রধান শিক্ষকদের মাসিক সভা, প্রতিবেদন তৈরি ও দাপ্তরিক কাজে ব্যস্থ থাকতে হয়। সহকারী শিক্ষকেরা পড়ান। প্রধান শিক্ষক না থাকা বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকেরা এ দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তাঁদের একসঙ্গে পাঠদান ও দাপ্তরিক কাজ ছাড়াও বিভিন্ন সভায় যোগ দিতে হয়। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আমরা জরুরি ভিত্তিতে শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।’

এ ব্যাপারে মুরাদনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন ১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট প্রকটের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ওই বিদ্যালয় গুলোর শিক্ষক সংকটের বিষয়টি আমাদের জানা আছে। সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদের বিপরীতে শিক্ষকের চাহিদা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশাকরি অল্প দিনের মধ্যেই বিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওই বিদ্যালয়গুলো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করব।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ