কুমিল্লা-৯ আসনের এমপি তাজুলের বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতাকর্মীদের লিখিত অভিযোগ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অনলাইনে এমপি তাজুলের ‘অনৈতিক’ ভিডিও ভাইরাল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ গত বেশ কয়েক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইনে কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও লাকসাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো.তাজুল ইসলামের একটি ‘অনৈতিক’ ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়েছে। এতে ওই আসনের দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ বিব্রত হয়ে পড়েছেন। গুগলের গিয়েও এমপি তাজুল ইসলামের নাম লিখে সার্চ দিলে ভেসে উঠছে তার বেশ কয়েকটি ‘অনৈতিক’ ভিডিও। একজন সাংসদের এমন অনৈত কর্মকান্ডে সারাদেশে আওয়ামী লীগের অর্জিত সুমান বিনষ্ট হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন দলটির একাধিক নেতাকর্মী। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে বিব্রত আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও।

এদিকে, ‘চরিত্রহীন’ এমপি মো.তাজুল ইসলামের কবল থেকে কুমিল্লা-৯ আসনকে রক্ষার আবেদন জানিয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি আবেদন করা হয়েছে। কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগকে বাঁচানোর আবেদন জানিয়ে দলের তূণমূল ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের পক্ষে মনোহরগঞ্জ উপজেলার লক্ষণপুর এলাকার গোলাম সরওয়ার নামের এক ব্যক্তি এই আবেদন জানান। আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ড.আবদুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগের একটি প্রাপ্তি কপি গণমাধ্যম কর্মীদের হাতে পৌঁছেছে। এই প্রতিবেদকের কাছেও ওই অভিযোগের একটি কপি রয়েছে।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পক্ষে দলের সভানেত্রীর কাছে করা ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বঙ্গবন্ধু হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কুমিল্লা-৯ আসনে আজ অনেকটাই হুমকির মুখে এবং অস্তিত্ব সংকটে। যার প্রতি আস্থা রেখে দলের দায়িত্ব দিয়েছেন সেই চরিত্রহীন ব্যক্তি মো.তাজুল ইসলাম এমপি আজ আওয়ামী লীগকে ধ্বংশের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। তিনি লাকসাম-মনোহরগঞ্জে জামায়াত, বিএনপি আর রাজাকারের বংশধরদের দিয়ে দল পরিচালনা করে আজ আওয়ামী লীগকে ধ্বংশের হলিখেলায় মেতে উঠেছেন। নেত্রী আপনি বিশ্বস্ত মাধ্যমে খোঁজ নিলেও জানতে পারবেন মো.তাজুল ইসলাম এমপি এখানে আপনার পিতা বঙ্গবন্ধুর রক্তের বিনিময়ে গড়া সংগঠন আওয়ামী লীগ চালায় জামায়াত, বিএনপি আর রাজাকারের বংশধরদের দিয়ে। তিনি আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মাধ্যমে হয়রানি করে কোনঠাসা করেছেনে। আবার তার অত্যাচারে অসংখ্য ত্যাগী কর্মীরা নির্যাতিত হয়ে এলাকা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। টানা তিনবার এমপি হয়ে তিনি দলের নয়, নিজের উয়ন্নয় ঘটিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর কাছে করা ওই আবেদনে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আরো উল্লেখ করেন, অত্যান্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে মো.তাজুল ইসলাম এমপি একজন চরিত্রহীন মানুষ হিসেবে আজ সকলের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। গত কয়েকমাস ধরে ফেসবুকসহ সকল অনলাইন মাধ্যমে তাজুল ইসলাম এমপির একটি অনৈতিক ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়েছে। লজ্জাজনক হলেও সত্য গুগলসহ সকল পর্ণ সাইটে গিয়ে তার নাম লিখে সার্চ দিলেই ভেসে উঠে একজন নারীর সাথে তাজুল ইসলামের অনৈক সম্পর্কের কেলেংকারীর ভিডিও। আমাদের জানা মতে লাকসাম-মনোহরগঞ্জের এমন কোন প্রামের নারী-পুরুষ বাদ নেই যারা এই ভিডিওটি দেখেননি। যার কারনে লজ্জায় আজ আমরা গ্রামের মা-বোনদের কাছে নৌকার জন্য ভোট চাইতে যেতেও পারি না।

সভানেত্রীর কাছে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আবেদন জানিয়ে আরো বলেন, মাননীয় নেত্রী আপনি তৃণমূল ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের আশা-ভারসার শেষ আশ্রয়স্থল। আপনি পিতা বঙ্গবন্ধুর মতোই দেশকে ভালোবাসেন, আওয়ামী লীগকে মায়ের মতো আঘলে রেখেছেন। তাই আপনি ছাড়া এই চরিত্রহীন ব্যক্তির কাছ থেকে আমাদের রক্ষা করার কেউ নেই। তাই আপনাকে বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করছি, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাজুল ইসলামের মতো একজন লম্পটকে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার প্রতীক নৌকার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন না দিয়ে অন্য যেকোন ব্যক্তিকে দিন। কারন তাকে মনোনয়ন দিলে এই আসনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবার পাশাপাশি আপনার দল অস্তিত্ব সংকটে পড়ার সম্ভাবনা শতভাগ। প্রয়োজনে বিশ্বস্থ মাধ্যমে খোঁজখবর নিলেও এসব ঘটনার শতভাগ সতত্যা পাবেন বলেও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।

গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এমন অভিযোগ এলে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে একই আসন থেকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বৃহত্তর লাকসামের উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য মো.নুরু ন্নবী ভূইঁয়া কামাল বলেন, দেখুন একজন মানুষ এমপি হলে তার বিরুদ্ধে বেশিরভাগ সময় স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। তিনি দুঃখজনক হলেও সত্য ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে সরাসরি দেখা যাচ্ছে এমপি তাজুল ইসলাম সাহেব একজন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণীর সঙ্গে অপকর্ম করছেন। যেটা শুধু লাকসাম-মনোহরগঞ্জ নয়, আজ পুরো বাংলাদেশে ভাইরাল। আর সব মিলিয়ে দেখা গেছে এমপি তাজুল সাহেবের এমন কর্মকান্ডের কারনে আজ সারাদেশে আওয়ামী লীগের অর্জিত সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আওয়ামী লীগ। এমন একজন চরিত্রহীন ব্যক্তির পক্ষে তৃণমূলের কর্মীরাতো দূরের কথা, আমাদের পক্ষের নৌকার ভোট চাওয়া সম্ভব না। এছাড়া এমন লম্পট্য বিষয় নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সদস্য ও মনোহরগঞ্জের ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা মো.মিজানুর রহমান বলেন, তাজুল ইসমাল আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী জামায়াতপন্থী এমপি। ১৯৯৬ সালে দলের প্রার্থী দুর্বলতার সুযোগে তিনি আওয়ামী লীগে ভিড়ার পর থেকে আওয়ামী লীগকে ধ্বংশ করেছেন, দলে ভিভাজন সৃষ্টি করেছেন। তার আপন মামাতো ভাই শীর্ষ রাজাকারপুত্র আবদুল কাইয়ুমকে মনোহরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি করেছেন। জামায়াত-বিএনপির ক্যাডারদের দলে ভিড়িয়ে হাজার হাজার ত্যাগী নেতাকর্মীদের মামলা-হামলা দিয়ে এলাকা ছাড়া করেছেন। এসব বিষয়ে দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের বার বার লিখিতভাবে জানিয়েও আমরা কোন প্রতিকার পাইনি। আর এমপি তাজুল ইসলাম একজন চত্রিহীন। ইন্টারনেটে গেলেই একাধিক নারীর সঙ্গে তার অনৈতিক ভিডিও দেখা যায়। লাকসাম-মনোহরগঞ্জের এমন কোন মানুষ নেই যে বিষয়টি জানে না। সরাসরি কথা হলো তাজুল ইসলামের মতো লম্পটকে মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগের একজন ত্যাগী ও তৃণমূল কর্মীও তার পক্ষে কাজ করবে না। এটা শতভাগ নিশ্চিত। আর তিনি (তাজুল) ছাড়া যে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হলে আমরা জীবন দিয়ে হলেও তাকে পাশ করানোর জন্য কাজ করবো।

কুমিল্লা-৯ আসন থেকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভিন্ন দলের একজন মনোনয়ন প্রত্যাশী নাম প্রকাশ না শর্তে বলেন, দেখুন একজন সংসদ সদস্য হলো ওই নির্বাচনী এলাকার অভিভাবক। যত অভিযোগই থাকুক, তবে তার চরিত্রটা অবশ্যই ভালো হওয়া উচিত। আজকে আপনারা নিজেরাই খোঁজ নিয়ে দেখুন, এমন কোন পর্ণ সাইট নেই যেখানে তাজুল ইসলাস এমপির অনৈতিক ভিডিও দেখা যায় না। সংসদ সদস্যের কাছে চাকরির জন্য গেলে যদি একজন নারীকে তার ইজ্জত বিলিয়ে দিতে হয় এরচেয়ে লজ্জাজনক আমাদের জন্য আর কি হতে পারে। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীও একজন নারী। আশা করছি তিনি বিষয়টি অব্যশই গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন।

দলীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকেই বিভিন্ন পর্ণ সাইটে এমপি তাজুলের এসব অনৈতিক ভিডিও দেখা যায়। এরপর নিজের অপকর্ম ঢাকতে এমপি তাজুল ইসলাম তার নিজস্ব প্যাডে লিখে এ ঘটনায় একটি জিডি করেন। ঢাকার তেজগাঁও থানায় করা ওই জিডির নম্বর-৩৫। তারিখ-১/১১/২০১১ইং। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বেশ কয়েকদিন যাবত তাহার ছবি দিয়ে ফেসবুক খুলে বিভিন্ন ধরণের কাল্পনিক খবর ও আপত্তিকর ছবি প্রদান করা হচ্ছে। এতে তাহার সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এজন্য বিষয়টি ডায়েরীভুক্ত করেছেন তিনি’।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না শর্তে একজন আইনজীবি বলেন, এমপি তাজুল ইসলাম ওই অনৈতিক ভিডিওর ঘটনায়তো জিডি করতে পারেন না। তিনি যদি সত্যি নির্দোষ হতেন তাহলে তিনি এ ঘটনায় পর্ণোগ্রাফি আইনে মামলা করতেন। আর আমি নিজেও ভিডিওটি বেশ কয়েকবার দেখেছি। একটু মনোযোগ সহকারে ভিডিওটি দেখলে আর হেডফোন দিয়ে শুনলে পরিস্কার বুঝা যায়। এটা এমপি তাজুল ইসলামেরই ভিডিও। লজ্জা থাকলে তিনি আরো আগেই পদত্যাগ করতেন।

এদিকে, এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও লাকসাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো.তাজুল ইসলাম এমপি বলেন, রাজনৈতিক কারনে আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার করা হচ্ছে। এখনকার মতো ২০১৩ সালে নির্বাচনের আগেও এমন একটি অনৈতিক ভিডিও প্রকাশ করে বিভিন্ন লেখালেখি করা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনায় মামলা করেছি, আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি জানেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। আর কয়েকজনের বিরদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে আপনি ঢাকার তেজগাঁও থানায় একটি জিডি করেছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, তাহলে মামলা কবে করেছেন আর কার কার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে- ২০১১ সালে ঢাকার তেজগাঁও থানায় করা জিডি কথা স্বীকার করলেও মামলা এবং কাদের বিরুদ্ধ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেই সম্পর্কে বিন্দু পরিমান কোন তথ্যই জানাতে পারেননি এমপি তাজুল।

দলের একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, তাজুল ইসলাম এ ঘটনায় শুধুমাত্র জিডির বাইরে আর কোন আইনগত ব্যবস্থাই নেননি। আর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রীর বিষয়টিও তিনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য বলছেন। এজন্য তাকে দল থেকে বহিস্কার করা উচিত।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ