দুইবার পরীক্ষা দিয়ে জেএসসি পাস করেছেন। এরপর এসএসসির টেস্ট পরীক্ষায় ৬ বিষয়ে ফেল করেছেন। মাধ্যমিকের কোনো পরীক্ষায় প্রথমবারে গণিত ও ইংরেজিতে পাস করতে পারেনি। এরপরের গল্পটা বেশ চমকানো। এ সব নিয়ে আরো জানাচ্ছেন জিএম ইমরান হোসেন।

এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ- ৩.৪৪ পাওয়ার পর ভীষণ একা হয়ে যায় ছেলেটি। বন্ধুরা এখন আর আগের মতো কাছে আসে না। খেলতেও ডাকে না মাঠে। পাড়া-প্রতিবেশিরা কেমন বাঁকা চোখে তাকায়। আর তারা এভাবে চলবেই না কেন? যেখানে বর্তমান সমাজে একজন শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার ফলাফল দেখে। যার ফলাফল যত ভালো, সে সমাজের চোখে ততবেশি সম্মানিত।

এই ছেলেটির নাম হৃদয় চন্দ্র দাস। বাবা বাদল চন্দ্র দাস আর মা সবিতা রাণী দাস। তাদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার সোহাতা গ্রামে।

২০১৪ সালের কোনো একদিন কলেজের প্রথম বর্ষে প্রথম সাময়িক পরীক্ষার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান চলছিলো। পরীক্ষায় ১ম, ২য়, ৩য় স্থান অধীকারীরা একে একে হাসি মুখে পুরস্কার নিয়ে যখন বাহবা কুড়াচ্ছিল ঠিক সেসময় সবিতা রাণীর একেবারেই অমলিন। অনুষ্ঠানস্থলের এক কোণে বসে আছেন। এরই পাশে বসে আছে হৃদয়। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে বলছিলো, হে প্রভু! আমার একমাত্র ছেলেকে যখন সবাই দূরে ঠেলে দিচ্ছে তখন তাকে দেখার দায়িত্ব একমাত্র তোমাকেই দিলাম।

প্রভুর কাছে মায়ের আকুতি সন্তান জানতে পারবে না তাকি হয়? হৃদয় ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। তার বুকে গেঁথেছিল অন্যদের পুরস্কার পাওয়া দেখে মায়ের আক্ষেপ করে বলা ‘আমার ছেলেটা যদি ভালো করে পড়তো’ কথাটা।

এজন্যইতো সেদিন অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে সারা রাস্তায় মায়ের সঙ্গে একটা কথাও বলিনি সে। আর সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলো, এবার থেকে যে ছেলেটি কলেজে প্রথম হবে সে একমাত্র ‘আমি-ই’।

আর হলোও তাই। তারপর থেকে হৃদয় আর কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়নি। এমনকি এইসএসসিতে ‘লাউর ফতেহ্পুর ব্যারিস্টার জাকির আহম্মদ কলেজ’ থেকে জিপিএ- ৪.৯২ পেয়ে কলেজ ফার্স্ট হয়।

তারপরের গল্পটাতো আরো নাটকীয়। সবার অবহেলার পাত্র হয়ে থাকা ছেলেটি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে সবাইকে অবাক করে দিল। তবে শাবির পলিটিক্যাল স্ট্যাডিজ বিভাগকে সে জীবনের বাকি পথচলার পাথেয় হিসেবে নিল।

জীবনের এ পথচলাটা মোটেও সহজ ছিল না শাবির পলিটিক্যাল স্ট্যাডিজ বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের এ শিক্ষার্থীর। জীবনের এ কঠিন মুহূর্তে জ্ঞানের প্রদীপ নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য বাবা-মায়ের বাইরে সবারে আগে যাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চায় সে, তিনি হলেন গৃহ শিক্ষক হাবিবুর রহমান স্বপন। যার নিঃস্বার্থ জ্ঞানের ছায়ায় তার এ পর্যন্ত আসা। তাছাড়া কলেজ শিক্ষক তানজিন আক্তার এবং কলেজ শিক্ষক মো. রবেল মিয়া, মো. আনিস উদ্দিন, মো. শাহজালাল ও তানজীন আক্তারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলেনি সে।

মজার ব্যাপার হলো, ফেলে আসা জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোর দিকে ফিরে তাকালে নাকি এখনো শিউরে উঠে সে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার আগের দুইমাস। দুইবারে জেএসসি পাস ও এসএসসির টেস্টে ৬ বিষয়ে ফেল করার পর শিক্ষককেরা যখন এসএসসি পরীক্ষার অনুমতি না দিয়ে মুখের উপরে বলেছিল, তাকে এসএসসি পরীক্ষার অনুমতি পত্র দিলে সব সাবজেক্টে ফেইল করে স্কুলের দুর্নাম বয়ে আনবে। আর আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যে ছেলেটি মাধ্যমিকের কোন পরীক্ষা প্রথমবারে গণিত ও ইংরেজিতে পাস করতে পারেনি। তাকে শিক্ষকেরা অমেধাবী ভাববে এটাই স্বাভাবিক।

যাই হোক, জীবনের এ পথচলায় পেছন ফিরে না তাকিয়ে বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় সামনে আগাতে চায় সে। এখন লক্ষ্য তার বিসিএস অ্যাডমিন ক্যাডার। আর লক্ষ্যে নিজেকে তৈরি করা।

সবশেষে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছুদের জন্য হৃদয়ের পরামর্শ, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় রেজাল্টে ৫-৬ নাম্বার কম থাকলে টিকে থাকাটা কঠিন। এখানে আপনাকে অতিরিক্ত আরো ৫-৬টি উত্তর সঠিক করতে হবে। তবুও, কোনো কারণে এসএসসি কিংবা এইসসিতে রেজাল্ট খারাপ হলে ভেঙে না পড়ে লক্ষ্যে, নিজস্ব সাজেশন, বিশ্বাস আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পাওয়াটা মোটেও অসম্ভব নয়। আর সে সেসময়টুকু আপনাকে যে যাই বলে বলুক।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: