রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠন যুবলীগের ছত্রছায়ায় ১০০টিরও বেশি জুয়াচক্র বা ক্যাসিনো চলছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে যুবলীগের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ঢাকায় অবৈধভাবে ক্যাসিনো ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে যুবলীগ নেতারা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার কাছে সবার সব তথ্য আছে। এরপর গত শনিবার দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় যুবলীগ নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় ক্যাডার চাঁদাবাজ বাহিনী গড়ে তুলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে সে। আমার সংগঠনে চাঁদাবাজ দরকার নেই।

আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ একটি প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছে, রাজধানীতে যুবলীগের বিভিন্ন অপতৎপরতা চলছে। শেখ হাসিনাকে অবহিত করা হয়েছে ঢাকায় অন্তত ১০০টি ক্যাসিনো চলছে যুবলীগের তত্ত্বাবধানে। পুলিশের এই প্রতিবেদন পেয়ে যুবলীগের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।

শেখ হাসিনার উদ্ধৃতি দিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, রাজধানীর সর্বত্র যুবলীগের নেতাদের ক্যাসিনো গড়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, যেখানে নেপাল থেকে ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য মেয়ে পর্যন্ত আনা হয়েছে। ওইসব ক্যাসিনোর জন্য নিরাপত্তা প্রহরীও আনা হয়েছে নেপাল থেকে। দলের সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে তথ্য আছে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় যুবলীগ নিয়ন্ত্রিত ক্যাসিনো-বার রয়েছে ছয়টি। এর সঙ্গে যুবলীগ দক্ষিণের প্রভাবশালী নেতাসহ অন্যরা রয়েছে। শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমার কাছে আরও তথ্য আছে রাজধানীর সব সুউচ্চ ভবনের ছাদ দখল নিয়েছে যুবলীগের নেতারা। সেখানে ক্যাসিনো খোলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুবলীগের সবার আমলনামা আমার হাতে এসেছে। আমি সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলে দিয়েছি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত শনিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায়ও যুবলীগের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ওই নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ যুবলীগের মহানগর উত্তর-দক্ষিণের প্রায় সব নেতা ঢাকায় ক্যাসিনো পরিচালনা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। আর এর ভাগ যুবলীগের সবার পকেটে যায়। প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে যুবলীগের মাসব্যাপী কর্মসূচি পালনের বিষয়টি অবহিত হলে শেখ হাসিনা বলেন, চাঁদাবাজির টাকা হালাল করতে আমার জন্মদিন উপলক্ষে কর্মসূচি নিয়েছে যুবলীগ। আমি এসব দোয়া চাই না।

সভাপতিমণ্ডলীর ওই সদস্য আরও বলেন, যুবলীগের নেতারা চাঁদাবাজি করে কে, কত টাকার মালিক হয়েছে সব হিসাব আমার কাছে আছে। দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন গাড়ি অস্ত্র থাকে তার বহরে। তিনি আরও বলেন, আমার দলে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী দরকার নাই। এরা দলকে, রাজনীতিকে কিছু দেয় না। এরা দলের বোঝা। সংশোধন না হলে এ দেশে জঙ্গি যেভাবে দমন করেছি সন্ত্রাসী বাহিনীও সেভাবে দমন করব।

ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। মতিঝিল-ফকিরাপুল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো থেকে শুরু করে কমপক্ষে সাতটি সরকারি ভবনে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি জমি দখলের মতো নানা অভিযোগ এ নেতার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলাও। রিয়াজ মিল্কি ও তারেক হত্যার পর পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেন খালিদ মাহমুদ ভূঁইয়া। ২০১২ সালের পর মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ছত্রছায়ায় ঢাকার এক অংশের নিয়ন্ত্রণ আসে খালেদের হাতে। নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করেন তিনি।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ: রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকায় কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন এ যুবলীগ নেতা। এর মধ্যে ১৬টি ক্লাব নিজের লোকজন দিয়ে আর ফকিরাপুল ইয়াং ম্যানস নামের ক্লাবটি সরাসরি তিনি পরিচালনা করেন। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ১ লাখ টাকা নেন তিনি। এসব ক্লাবে সকাল ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত ক্যাসিনো বসে। খিলগাঁও-শাহজাহানপুর হয়ে চলাচলকারী লেগুনা ও গণপরিবহন থেকে নিয়মিত টাকা দিতে হয় খালেদকে। প্রতি কোরবানির ঈদে শাহজাহানপুর কলোনি মাঠ, মেরাদিয়া ও কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। খিলগাঁও রেল ক্রসিংয়ে প্রতিদিন রাতে মাছের একটি হাট বসান এ নেতা। সেখান থেকে মাসে কমপক্ষে ১ কোটি টাকা আদায় করেন তিনি। একইভাবে খিলগাঁও কাঁচাবাজারের সভাপতির পদটিও দীর্ঘদিন তিনি ধরে রেখেছেন। শাহজাহানপুরে রেলওয়ের জমি দখল করে দোকান ও ক্লাব নির্মাণ করেছেন।

৭ সংস্থার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ : অনুসন্ধানে জানা যায়, মতিঝিল, শাহজাহানপুর, রামপুরা, সবুজবাগ, খিলগাঁও, মুগদা এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ এ নেতার হাতে। এসব এলাকায় থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যথাক্রমে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক), রেলভবন, ক্রীড়া পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, ওয়াসার ফকিরাপুল জোনসহ বেশিরভাগ সংস্থার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন এ নেতা। ‘ভূঁইয়া অ্যান্ড ভূঁইয়া’ নামের প্রতিষ্ঠানটি দিয়ে তিনি তার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

যারা এলাকাছাড়া : এক সময়ের দাপুটে ছাত্রনেতা মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোহেল শাহরিয়ারকে ভয় দেখিয়ে দেশছাড়া করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সোহেল শাহরিয়ার বর্তমানে কানাডায় বসবাস করেন। একইভাবে ৮নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি আলী হোসেন ও ১২নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি কবির মাহমুদকেও ভয় দেখিয়ে শহরছাড়া করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এলাকাবাসী জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাচনে কাউন্সিলর হতে ব্যাপক কার্যক্রম চালান খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে মমিনুল হক সাঈদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর তার সঙ্গেও বিরোধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। একই সঙ্গে ১১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হামিদুল হক শামীমকেও কোণঠাসা করে রেখেছেন প্রভাবশালী এ নেতা।

জানতে চাইলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমার বাসায় আসেন। আমার অবস্থা দেখে যান।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী ও সম্পাদকমন্ডলীর দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রলীগের মতো যুবলীগের ওপর চরম ক্ষুব্ধ শেখ হাসিনা। পুলিশের রিপোর্ট মেনে প্রধানমন্ত্রী পরে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ বলেন, ‘যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তা আমরা সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে জেনেছি। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ এখনো আসেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগ এলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’ যুবলীগের এই নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আমাদের যেভাবে নির্দেশ দেবেন আমরা সেভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের একটা ট্রাইব্যুনাল আছে যেখানে অভিযুক্ত নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আমাদের ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত নেতাদের শিগগিরই ডাকবে। তাদের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত নেওয়া হবে। সেখানে অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া হবে সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী।’

সূত্রঃ দেশ রূপান্তর