ডেস্ক রিপোর্টঃ সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থতার আরও একটি বছর পার করল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ জন্য ব্যাপক সমালোচনাও আছে। তবে আরও দুটি আলোচিত হত্যা মামলাতেও কূলকিনারা করতে পারছে না পুলিশ।

অপর দুটি মামলা হলো কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু এবং চট্টগ্রামে সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যা। আর এই তিন মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থতায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ক্ষুব্ধ। দেশবাসীও সমালোচনায় মুখর। তবে কোনো ব্যাখ্যা নেই তদন্ত কর্মকর্তাদের।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই তিনটি মামলা নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। এতে কী এমন রহস্য আছে, সে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাজারো মানুষের আছে নানা প্রশ্ন।

জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, ‘কোনো কোনো মামলার তদন্তে দেরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতে ব্যাখ্যা দিতে হয়। আদালত যদি তাদের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তো আর কিছু বলার নেই।’

এর মধ্যে সাত বছর পূর্তি হয়েছে সাগর-রুনি হত্যায়। ২০১২ সালের আজকের দিনে ভোরে পশ্চিম রাজাবাজার এলাকা থেকে এই সাংবাদিক দম্পতির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার হয়। সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘটনাস্থলে গিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় আর আসেনি। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন দুজন। তদন্ত কর্মকর্তা পাল্টেছে বহুবার। কিন্তু এই মামলার কূলকিনারা হয়নি।

>>আরো পড়ুনঃ  ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে !

এ ঘটনায় নিহত রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। প্রথমে মামলাটির তদন্ত করেছেন শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক এবং পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। দুই মাস পর হাইকোর্টের আদেশে মামলাটির তদন্ত দেওয়া হয় র‌্যাবকে। ওই দিন থেকে আজ পর্যন্ত ৬২ বার সময় নিয়েছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।

ক্ষুব্ধ নওশের বলেন, ‘সাত থেকে আট মাস আগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হওয়ায় একবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল র‌্যাব। এখন আর কোনো যোগাযোগ নেই। তাদের মৃত্যুবার্ষিকীতে অনেকই ফোন করে। কিন্তু পরে আর কিছুই হয় না।’

চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি এখন তদন্ত করছেন র‌্যাবের সহকারী পুলিশ সুপার শহিদার রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি ২৫ নভেম্বর মামলার তদন্তভার পেয়েছি। কাজ চলছে।’

তদন্তের কোনো অগ্রগতি আছে কি না, এ বিষয়ে কোনো তথ্যই জানাননি এই র‌্যাব কর্মকর্তা।

কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী তনু হত্যাও এক দুর্লঙ্ঘনীয় রহস্য হয়ে রয়েছে। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে যান এই তরুণী। বাসায় না ফেরায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। পরে রাতে বাসার অদূরে কালা পাহাড় নামের একটি জঙ্গলে তার মরদেহের সন্ধান মেলে।

এ ঘটনার পরদিন বাবা ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে করেন মামলা। থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এখন তদন্তভার সিআইডি কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জালাল উদ্দীন আহমেদের হাতে।

>>আরো পড়ুনঃ  চীনে মুসলিম নারীদের জোরপূর্বক বন্ধ্যা বানানো হচ্ছে

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, ‘মামলাটি সিআইডির কাছে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা কিছুই করেনি। মামলাটির উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। চেয়েছিলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করব। কিন্তু সেটাও করতে পারলাম না। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।’

জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন বলেন, ‘মামলাটি অধিক গুরুত্বের সঙ্গেই তদন্ত করা হচ্ছে। এখানে আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকেই গ্রেপ্তার করা যায়নি।’

একই পরিস্থিতি চট্টগ্রামে নিহত মিতু হত্যার ক্ষেত্রেও। এই মামলাটি চলছে আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে। কিন্তু পুলিশ জানাতে পারছে না খুনি কে, কী কারণে এই হত্যা।

২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে খুন হন সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা মিতু। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ছুটে যান পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বাবুল আক্তার জঙ্গিবিরোধী একাধিক অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ধারণা করা হয়, এটি উগ্রবাদীদের কাজ। পুলিশের বক্তব্যও ছিল তেমনই।

মাঠে নামে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা। আর এটা স্পষ্ট হয় যে, এই হত্যা উগ্রবাদীদের কাজ নয়। তবে যে রহস্য ছিল, সেটির কাছাকাছিও যেতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তারা।

এর মধ্যে এই হত্যা মামলা নিয়ে নানা কথা ছড়িয়েছে। পুলিশ বাহিনী থেকে অবসরে গিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন বাবুল আক্তার। তার শ্বশুর বাবুলের কাছে আরেক মেয়েকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বাবুল রাজি হননি। এরপর বাবুলের বিরুদ্ধে তার মেয়ে হত্যার অভিযোগ আনেন।

>>আরো পড়ুনঃ  বিশ্বের ‘সবচেয়ে কুখ্যাত সন্ত্রাসী’ মোদী!

কিন্তু আড়াই বছরেও এ হত্যার কূলকিনারা করতে না পারায় তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তুষ্ট মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন। পুলিশের সাবেক এই ইনস্পেক্টর জানান, তদন্ত কোন পর্যায়ে সেটাও তাদের জানানো হয়নি।

এর মধ্যে বাবুলের পুলিশের চাকরি ছাড়ার বিষয়টি নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য। এটা স্পষ্ট যে তিনি চাকরি ছেড়েছেন চাপের মুখে। তবে কারা চাপ দিয়েছে, কেন চাপ দিয়েছে, সেটা নিয়ে মুখ খুলছেন না কেউ। বাবুলও এ বিষয়ে কিছু বলেন না, পুলিশ সদর দপ্তরও নিশ্চুপ।

মামলাটির তদন্ত করছেন চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কাজ প্রায় শেষ, শিগগির অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে। এরই মধ্যে মামলায় ১১ আসামির সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, যাদের তিনজন জামিনে। এর মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে দুজন।’

মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘মামলার তদন্তের ব্যাপারে আমি তেমন কিছুই জানি না। অনেক দিন হয়েছে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বাবুল আক্তার কেউই এখন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। পুলিশ এই মামলায় অভিযোগপত্র দিলে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’

সূত্রঃ ঢাকা টাইমস

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ