ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, বিকৃত যৌনতা!

ডেস্ক রিপোর্টঃ চৌধুরী ছানাউল্লাহ। সৌদি প্রবাসী। বিয়ে করেননি এখনও। সারাদিন কাজ করার পর একটু আনন্দ খুঁজতেই ফেসবুকে ডু মারা। এভাবেই একদিন কেউ একজন একটি ক্লোজড গ্রুপে তাকে এ্যাড করে নেয়। প্রথমে গ্রুপে ডুকে তো সে অবাক। কি সব অশ্লীল পোস্ট। কেউ কমেন্টস করছে, যে একটা ডিজিটাল মার্কেট। কেউ বিভিন্ন রেট হাকাচ্ছে। কেউ নানা রকম আকর্ষণীয় লোভনীয় প্রস্তাব দিচ্ছে। ছানাউল্লাহ অনেক দেখার পর বুঝতে পারল এটা একটা যৌনতার ডিজিটাল ভার্সন। যেখানে ভার্চুয়ালী বেচাকেনা হয় যৌনতা। নিজেও লোভে পরে গেলেন। একটা ফেক আইডি খুলে সেখান থেকে একজনের অফারে কমেন্ট করে সার্ভিস নিতে চাইলেন। একটি মেয়ে আইডি থেকে জানানো হল টাকা এ্যাডভান্স করার জন্য। ছানাউল্লাহও বিদেশ থেকেই অনেক কষ্টে বিকাশ করলেন। এরপর থেকে সেই আইডি লাপাত্তা। বুঝলেন ধোকা খেয়েছেন। এরপর আরও অনেক এরকম গ্রুপের সাথে যোগ হয়ে দেখলেন কোথাও সত্যিকারের ভার্চুয়াল যৌনতা দেয়া হয় না। করা হচ্ছে প্রতারণা।

সময়ের সাথে সাথে পাল্টাচ্ছে আমাদের মানুষিকতা, রুচি, অপরাধের ধরন। এরকমই বর্তমানে একটি অপরাধ বা বিকৃত বিষয় হল ভার্চুয়াল যৌনতা।

ভার্চুয়াল যৌনতা কি: ভার্চুয়াল বলতে বোঝায় এটার কোন বাস্তবে অস্তিত্ব নেই। এটা ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এটা দ্বারা সাধারণত ইন্টারনেটের জগতকে বোঝানো হয়। আর তাই অনলাইনকে ভার্চুয়াল জগৎ বলা হয়।

ভার্চুয়াল যৌনতা হলো সাময়িক উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে মোবাইলে বিভিন্ন স্যোসাল মিডিয়া ব্যবহার করে অডিও বা ভিডিওতে যৌনতায় মেতে ওঠা। একজন নারী কিংবা পুরুষ ইমো, ভাইবার, ম্যাসেঞ্জারসহ নানা রকম স্যোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে ভার্চুয়াল যৌন সুখ নেয় ও দেয়। ভার্চুয়াল যৌনতা একটা যৌন বিকৃতি। এটা কখনও যৌন সুখ আহরণের মাধ্যম হতে পারে না। এর প্রভাব পরবর্তী জীবনে পরে।

ভার্চুয়াল যৌনতায় ভিডিওতে নারীর নানা রকম অশ্লীল কার্যকলাপ এবং অডিওতে নানা রকম অশ্লীল শব্দ উচ্চারনে পুরুষ যৌন তৃপ্তি নেয়ার চেষ্টা করে। এর বিনিময় নারীকে অর্থ প্রদান করতে হয়।

অনুসন্ধানী চোখ যা বলে: ফেসবুক স্যোশাল মিডিয়ায় গত ১ বছর ধরে পর্যবেক্ষন করছিল আমাদের প্রতিবেদক। তার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নানা রকম চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভার্চুয়াল এই জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে ৫ থেকে ৬ জন মধ্যস্থতাকারী। যাদের কাজ হল বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে তাতে এ বিষয় আগ্রহীদের অর্ন্তভূক্ত করা। এরপর মেয়েদের সাথে যোগাযোগ করা যারা এ রকম সার্ভিস প্রদান করতে চায়। গ্রুপে সত্যিকারে যারা কাজ করে তাদের লিস্ট তৈরি করে প্রকাশ করা হয়। কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয় আগ্রহী মেয়েদের। যেমন; ক্যাম সার্ভিস, ভয়েস সার্ভিস, রিয়েল সার্ভিস। উল্লেখ্য যোগ্য গ্রুপ গুলোর মধ্যে রয়েছে Trustful Cottage, VIP Screenshot, dhaka real live together, ভার্চুয়াল এন্টেরটেইনমেন্ট ক্লাব, Real Entertainment Club By Onu Rahman,নিষিদ্ধ পল্লী, Masti Point। এসব গ্রুপ যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সবাই ছদ্ম নামে এখানে গ্রুপ পরিচালনা করে। গ্রুপ নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে রয়েছে, মুহাম্মদ উসমান, রহিমা বিবি, শারমিন আক্তার, অনু রহমান, সালমান চৌধুরী, নুরুল উল্লাহসহ আরও অনেকেই।

ডিজিটাল পতিতালয়: ভার্চুয়াল যৌনতার সাথে এ জগত থেকে পাওয়া যায় আধুনিক পতিতাদের। মধ্যস্থতকারীর সহযোগীতায় নির্দিষ্ট স্থানে বা ফ্ল্যাটে নেয়া হয় খদ্দেরকে। কখনও কখনও ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব খোয়াতে হয় খদ্দেরের। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পতিতাদের ফ্ল্যাটে যে সার্ভিস দেয়া হয় তার বেশির ভাগই মিরপুর, উত্তরা, বনানী এবং গুলশানে।

ভার্চুয়াল যৌনকর্মীদের আয়: এদের আয় শুনলে যে কারো চোঁখ কপালে উঠতে বাধ্য। এক একটি ক্যাম সার্ভিসের জন্য নিয়ে থাকে ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা। এতে করে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪টা সার্ভিস দিলে মাসে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করে তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভার্চুয়াল যৌনকর্মী জানায়, ‘তারা বেশির ভাগই শিক্ষিত এবং শখের বসেই এ কাজ করেন। তবে অনেকেই আছেন টাকার প্রয়োজনে এ লাইনে আসেন।’

এই যৌন কর্মীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যদি কোন কাজ পান এই কাজ ছেড়ে দিবেন কিনা? উত্তরে তিনি জানান, ‘দেখুন এখানে কাঁচা টাকা পাওয়া যায়, তাই কষ্ট করে অন্য কোন কাজ করতে ইচ্ছে করে না।’

খদ্দের কারা: ভার্চুয়াল যৌনতার খদ্দের কয়েক প্রকার রয়েছে। যৌন কর্মীদের প্রধান টার্গেট প্রবাসী যুবক। এরপরে ছাত্র, একাকীত্বে ভোগা পুরুষ, ব্যবসায়ীসহ নানা পেশাজীবী। তবে বেশিরভাগের বয়সই ২০ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। এ বিষয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খদ্দের জানান, ‘আমি মুলত একাকীত্ব অনুভব করি। আর এখান থেকে আনন্দ নেওয়ার চেষ্টা করি। জানি এটা কোন আনন্দের বিষয় না। তবুও নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল।’

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কি বলছে: আমাদের দেশের ভার্চুয়াল অপরাধগুলো চিহ্নিত করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। আর এই বিষয়টা লোক চক্ষুর আড়ালে হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে না। এমনকি এ বিষয় কেউ কোন অভিযোগও করে না।

এ বিষয়ে পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের এডিসি মিশুক চাকমা বিডি২৪লাইভকে বলেন, ভার্চুয়াল জগতের এ যৌনতা একেবারে বন্ধ করা সম্ভব না। তারপরও আমরা আমাদের সাধ্য মতো চেষ্টা করছি। কেউ তথ্য উপাত্ত দিয়ে মামলা করলে আমরা ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেন, সভ্যতার শুরু থেকেই বেশ্যানীতির প্রতি মানুষের ঝোঁক রয়েছে। হঠাৎই এগুলো বন্ধ করা সম্ভব না। আজ যদি কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। তাহলে কাল দেখা যাবে সে আদালত থেকে জামিন নিয়ে অন্য নামে আইডি খুলে এ অপরাধগুলো করছে। যারা এসব কাজ করছে তাদের সংশোধন হওয়া দরকার এবং অন্য সকল ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা আছেন যারা, তাদের সচেতন হতে হবে। সচেতন হলে এগুলো কমানো সম্ভব।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের যে লোকবল আছে তা যথেষ্ট নয়। তাছাড়া পুলিশের ভিতরে এ বিষয়ে অতটা ডেডিকেট টিমও নেই। ডিএমপি, সিআইডি ও পিবিআই’র তিনটা টিম কাজ করছে। এর মধ্যে আমরা যারা ডিএমপির টিমে কাজ করছি। আমরা চেষ্টা করছি ভার্চুয়াল জগতের এ সকল অপরাধীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে।

তিনি আরও বলেন, আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে একটা টিমকে গ্রেফতার করেছিলাম। তারা পুরুষ বা মহিলা দিয়ে হোম সার্ভিস দিয়ে থাকে কিন্তু কয়েকদিন পর তারা আদালত থেকে জামিন নিয়ে তারা এসব কাজই করছে বলে আমাদের ধারণা।

যৌনতা হচ্ছে প্রত্যেক নারী ও পুরুষের অন্যতম চাহিদা। পুরুষরা সুন্দরী নারীদের দিকে তারা তাকাবে এবং আকর্ষিত হবে এটা স্বাভাবিক কিন্তু এই জায়গাতেই মানুষের মস্তিষ্ক, বিশেষ করে পারফ্রন্টাল কর্টেক্স এটাকে প্রতিরোধ করে। পারফ্রন্টাল কর্টেক্স বিবেচনা বোধ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, পরিবার এ গুলির উপর ফোকাস করে। তখন আপনাকে ভাবতে হবে আপনি শুধুমাত্র জৈবিক উদ্দেশ্য পূরণ করার প্রাণী নন, মস্তিষ্কে হরমোনের প্রভাবে যে প্রতিক্রিয়া হয় তা অনুসরণ করা উচিত নয়। আপনি তখন নিজেকে প্রশ্ন করবেন আমার সাথে যে সম্পর্কগুলি রয়েছে তার লক্ষ্য কী? আপনার জীবনে যেসব মানুষেরা রয়েছে তাদের ভালোবাসুন এবং তাদের নিরাপত্তা প্রদান করুন। শেষ পর্যন্ত এটাই আপনার কাজে লাগে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ