বছরজুড়ে শতাধিক খুনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন কুমিল্লাবাসী

সাদিক মামুনঃ শতাধিক খুনের ঘটনার মধ্যদিয়ে ২০১৭ সাল পার করেছে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রাচীন ঐতিহ্যের জেলা কুমিল্লা। একের পর এক খুনের ঘটনায় আতঙ্কিত সময় পার করেছে সাধারণ মানুষ। পারিবারিক কলহ, দ্ব›দ্ব, যৌতুকের কারণ, ছিনতাইকারির শিকার হয়ে, ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের আধিপত্য, অপহরণ ও মুক্তিপণ না পেয়ে প্রতিমাসে জেলায় ১০-১২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। একটি খুনের মামলার তদন্ত শুরু না হতেই আরেকটি খুন। এভাবে ২০১৭ সালে প্রায় ১০৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লার সমাজবিদরা বলছেন সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় জেলায় খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। তাই সমাজে বসবাসকারিদের একে অন্যের প্রতি সহনশীল হতে হবে। সম্পর্কের উত্তরণ ঘটাতে হবে। এছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, টহল ব্যবস্থা জোরদার এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পরামর্শ আমলে নেয়ার জন্য থানাগুলোতে ওপেন হাউজ ডে কার্যক্রম প্রতিমাসে নিয়মিত করতে পারলে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে এবং তাতে বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত হত্যাকান্ড ও অন্যান্য অপরাধ প্রবনতা কমে আসবে।

কুমিল্লা জেলা আইন-শৃংখলা কমিটির সভাগুলোতে খুন ও অন্যান্য অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়েও কমিটির সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জেলার অপরাধচিত্রের তথ্যালোকে এবছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত কুমিল্লার ১৭টি থানা এলাকায় ৯৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর ডিসেম্বর মাসে পত্রিকায় প্রকাশিত খুনের সংখ্যা প্রায় ১০টি। বছরজুড়ে প্রতিমাসে ৯টি করে খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব খুনের মধ্যে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এমন সংখ্যাও কম নয়। তারমধ্যে কয়েকটি আলোচিত খুনের মধ্যে রয়েছে দাউদকান্দি উপজেলার যুবলীগ নেতা আমির হোসেন ওরফে রাজন হত্যাকান্ডটি। গত ৬ মে দাউদকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার পথে মুখোধারি সন্ত্রাসীরা বলদাখাল রাস্তার মোড়ে রাজনকে ঘেরাও করে দেশিয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করে। অন্যান্য খুনের মধ্যে ৩ ডিসেম্বর হোমনার দড়িচর গ্রামে রুবেল নামে এক যুবক খুন হোন। ৬ ডিসেম্বর চান্দিনার বেলাশ্বর গ্রামের ৬ বছর বয়সী শিশুকন্যা সুবর্না আক্তার মীমকে খুন করে ওই গ্রামের গাড়ী চালক ওমর ফারুক। একইদিনে মুরাদনগরের নেয়ামতপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নজরুল ইসলাম নান্নু মিয়া খুন হোন। ১৯ নভেম্বর কুমিল্লা শহরের নতুন চৌধুরীপাড়ায় একটি ভাড়াবাড়িতে খুন হোন আবুল খায়ের গ্রæপের মার্কেটিং কর্মকর্তা মাসুদ মজুমদার। ৪ নভেম্বর হোমনার দুলালপুর চন্দ্রমনি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র জাহিদ হাসানকে খুন করা হয়। ১৫ অক্টোবর মেঘনা উপজেলায় খুন হোন ট্রলার চালক আমীর হোসেন। ৫ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা ক্লাবের কর্মচারি কামরুলকে খুন করে মেঘনায় ফেলে দেয়া হয়। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে ১৯ এপ্রিল মুরাদনগরের রহিমপুর গ্রামে আওয়ামী লীগের দুইগ্রæপের সংঘর্ষে গলাকেটে খুন করা হয় ফারুক ও সাইদুর নামে দুইজনকে। ১ জুন মুরাদনগরে খুন হোন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ডেপুটি কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম। ১১ এপ্রিল কুমিল্লা সদরের পালপাড়া ব্রিজের নিচে রক্তাক্ত লাশ মিলে পত্রিকা হকার ফারুকের। কুমিল্লা ব্রিটিনিয়া ইউনিভার্সিটির ছাত্র শাহজাদাকে ২৭ মে তার বন্ধুরা নগরীর নজরুল এভিনিউতে খুন করে। ৯ ফেব্রæয়ারি কুমিল্লা শহরতলীর চানপুরে বিল্লাল বাহিনীর হাতে খুন হোন ব্যবসায়ি ছাদেক আলী। ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় ৮ জানুয়ারি নগরীর নুরপুরে খুন হোন হাসান নামে এক যুবক। ২০১৭ সালের এসব খুনের ভিড়ে শিশু খুনের ঘটনাও কম নয়।

আইন শৃংখলা কমিটির সভার তথ্যানুসারে গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত কুমিল্লার ১৬ উপজেলার ১৭ টি থানা এলাকায় ৯৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। তারমধ্যে জানুয়ারি মাসে ৬টি, ফেব্রæয়ারিতে ৫টি, মার্চে ১৩টি, এপ্রিলে ৭টি, মে মাসে ৯টি, জুনে ১৩টি, জুলাই মাসে ৮টি এবং আগস্ট মাসে ১১টি, সেপ্টেম্বর মাসে ১২টি, অক্টোবর মাসে ৯টি, নভেম্বর মাসে ৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর ডিসেম্বর মাসে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে খুনের ঘটনা মিলেছে প্রায় ১০টি। সবমিলে শতাধিক খুনের ঘটনায় কুমিল্লাবাসী ২০১৭ সাল পার করেছে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কের মধ্যদিয়ে।

সূত্রঃ ইনকিলাব

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ