‘মামা আমারে একটু দেন, টাকা লাগলে নেন’

ডেস্ক রিপোর্টঃ ‘মামা হাফ হবে, আমারে একটু দেন; অনেকক্ষণ হল খাই না। টাকা লাগলে নেন, তবুও একটু দেন’ এমনিভাবেই মিনতির সুরে একজন আরেকজনের কাছে চাইছে। কি চাইছেন তিনি? দূর থেকে তার ‘অসহায়ত্ব’ দেখে মনে হল, সারাদিন ওই ব্যক্তির পেটে কিছু পড়েনি। কাছে যেতেই চোখ কপালে ওঠে গেল। খাদ্য নয় মাদকের জন্য তার এমন ‘হাহাকার’।

রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পার্শ্ববর্তী এ উদ্যানের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে মানুষের জটলা। আরেকটু ভেতরে গেলেই দেখবেন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে জটলা পাকিয়ে বসেছে নানা বয়সী তরুণ তরুণী। সেই সঙ্গে উড়ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।

বৃহস্পতিবার (২৮ জুন) দুপুরের দিকে ঐতিহাসিক এ উদ্যান ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র। এখানে যত্রতত্র প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি চলে। মাদক কিনে সেখানে বসেই সেবন করে মাদকসেবীরা। পাশাপাশি ভবঘুরেদের আড্ডায় পরিণত হয়েছে উদ্যানটি। এতে দর্শনার্থীরা উদ্যানটিকে অনিরাপদ মনে করছেন।

সম্প্রতি সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে ইয়াবা বিক্রি অনেকটা কমে গেছে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ‘গাঁজা’ এটা রয়ে গেছে আগের মতই। আর রাজধানীর শাহবাগ থানার পাশেই প্রকাশ্যে এই গাঁজা সেবনের চিত্র দেখা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই বন্ধু বলেন, ‘সারাদিন খাই আর ঘুরে বেড়াই। টাকার কোনো সমস্যা নাই। এমনিতেই টাকা চলে আসে। আর টাকা এলেই, গাঁজা। এখনতো কমই, সন্ধ্যা হলে আরও বেড়ে যায় মানুষের আনাগোনা। তখন আরও ভালোভাবেই বিষয়টা আপনার নজরে আসবে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ উদ্যান এলাকার পাশেই কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে এখানে মাদক বিক্রির একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট রয়েছে। সেই সিন্ডিকেট উদ্যানে শিক্ষার্থীদের কাছে মাদক সাপলাই দিয়ে থাকে। এখানে অনেক সময় বিভিন্ন শিল্পীদের আগমন ঘটে। তারাও ওই মাদক সেবন করতেই এখানে আসে।

সারি সারি বৃক্ষের নিচে ৫/৬ জনের গ্রুপ বসে প্রতিদিন। সেই গ্রুপে গাঁজা বিক্রি ও সেবনের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি ও ভাড়া দিয়ে থাকেন এক দল মহিলা। তারা নিজেরাও সেই গ্রুপের সঙ্গে বসে গাঁজা সেবন করেন। পুরুষের পাশাপাশি মহিলাদেরও উপস্থিতি লক্ষণীয়। মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী এবং সক্রিয় হলো বুবলী নামের এক প্রতিবন্ধী মাদক সম্রাজ্ঞী।

গতকাল (২৮ জুন) বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির আশে পাশের এলাকায় অবস্থান করে জানা গেছে, গাঁজা সেবন করতে আসা তরুণ-তরুণীদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই স্বল্পমূল্যে পাওয়ায় দিন দিন গাঁজা সেবনে আসক্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ওই এলাকায় শুধু গাঁজা নয়, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক সেবনও চোখে পড়ে। আর পরে নানা ধরনের সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে এসব তরুণ-তরুণীরা। কিছুদিন পর পর পুলিশের তোড়জোড় থাকলেও পরে আবার সেই আগের মতই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নাঈম (ছদ্মনাম) নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘গ্রামে থাকতে গাঁজা কি চিনতাম না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বন্ধুদের সঙ্গে চলতে গিয়ে সেটা চিনেছি। এখন নিজেও সেবন করি। অনেক চেষ্টা করেছি এটা থেকে দূরে থাকার কিন্তু পারিনি।’

বাউলদের সঙ্গে আসা সেতারা বাজক আক্কাস মিয়া (ছদ্মনাম) বলেন, ‘মাঝে মধ্যে এখানে গুরুদের সঙ্গে আসি। কিন্তু এখানে যারা আসে তারা একটু আকটু খায়। গাঁজা খেলে কিছু হয় না। তবে সুরের জন্য ভালো হয়।’

এ ব্যাপারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ড ইমদাদুল বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়তই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি মাদকসেবীদেরকে উদ্যান থেকে বের করার কিন্তু কখন কীভাবে প্রবেশ করে তা আমরা জানি না। আর আমরা তো গেইটেই থাকি। ভিতরে কী হয় তা আমরা দেখবো কী করে।’

এ ব্যাপারে শাহবাগ থানার ওসির মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ