যে কারণে হত্যা করা হয় কুমিল্লায় কলেজ ছাত্র সাগর দত্তকে (ভিডিও)

ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লায় চাঞ্চল্যকর কলেজ ছাত্র সাগর দত্ত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব নয়, জিম্মি করে টাকা আদায় করতে গিয়েই সোহাগ উদ্দিন রানা ও নাসির নামে তার এক সহযোগী মিলে সাগরকে খুন করেছে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবির) আলমগীর হোসেন এ তথ্য জানান।

মামলার প্রধান আসামী সোহাগ উদ্দিন রানাকে গ্রেফতারের পর শনিবার দুপুর ১টায় কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।

আলমগীর হোসেন বলেন, শুক্রবার রাতে ঢাকা থেকে রানাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি রানা ও নাসির মিলেই সাগরকে হত্যা করেছে। মামলার অপর আসামি নাসিরকে গ্রেফতার করতে পারলেই আরো বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে’ বলেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

এছাড়াও উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তদন্তের সার্থে বিষয়টি এখন গোপন রাখা হচ্ছে। তবে অস্ত্রের যোগানদাতাকেও অচিরেই গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, বেশ কয়েক বছর আগে সোহাগ উদ্দিন রানা স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়া যায়। সেখানে গিয়ে সে একটি পেট্রোল পাম্পে চাকুরি নেয়। কিন্তু কিছুদিন পর অবৈধ হয়ে যাওয়ায় মালয়েশিয়া পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। রানা সেখানে দেড়মাস জেল খাটে।

রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে জেলা পুলিশের এ কর্মকর্তা আরো বলেন, জেল থেকে বের হয়ে এক বাংলাদেশি দালালের মাধ্যমে আফ্রিকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় রানা। আফ্রিকার যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৬ লাখ টাকা তার কাছে কিংবা তার পরিবারের কাছে নেই। পরবর্তীতে রানা মালয়েশিয়া নিয়ে যাবে বলে ৪ জনের কাছ থেকে তার বাবার মাধ্যমে ৮ লাখ টাকা নেয়। কিন্তু তাদেরকে মালয়েশিয়া নিতে পারেনি।

পরে ওইসব লোকজনের চাপে রানার বাবা জায়গা-জমি বিক্রি করে তাদের টাকা শোধ করে’ বলেন আলমগীর হোসেন।

তিনি আরো জানান, এরিমধ্যে বাংলাদেশে চলে আসে রানা। বিষয়টি গোপন রাখে পরিবারের কাছে। এরপর থেকেই সে ঋণের চাপে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং সিদ্ধান্ত নেয় অস্ত্র কিনে কাউকে জিম্মি করে টাকা সংগ্রহ করবে।

সিন্ধান্ত অনুযায়ী রানা একজনের কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ৭ দশমিক ৬৫ বোরের একটি পিস্তল কিনে।

হত্যাকাণ্ডের ২/৩ দিন পূর্বে কুমিল্লার রেইসকোর্স এলাকার বিএইচ ভূইয়া হাউজের নিচতলায় বাসা ভাড়ার লিফলেট দেখে তার সহযোগী নাসিরকে নিয়ে ওই মেসে যায় এবং বাসা ভাড়ার কথা বলে ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ৩ এপ্রিল ওই মেসের সদস্য সজিবের কাছে ১ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে আসে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন রানা এবং নাসির ওই বাসায় প্রবেশ করে সাগর ও সজিবকে মেয়েদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক আছে বলে ব্ল্যাকমেইল করা চেষ্টা করে।

এক পর্যায়ে সাগর ও সজিবকে চেয়ারের সাথে বেঁধে তাদের পিতামাতার কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু কাজ হচ্ছেনা দেখে রানা ও নাছির সাগর ও সজিবকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়। কিন্তু তারা ঘুমায় না। ফলে সারারাত দুজনের উপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।

এসময় সাগর একপর্যায়ে রশি খুলে চিৎকার দিতে থাকে। এদিকে ভোরও হয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাবে এ ভয়ে রানা ও নাসির সিদ্ধান্ত নেয় সাগর ও সজিবকে মেরে ফেলবে। সেই লক্ষ্যে রানা সজিবকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার বুকে গুলি করে। তখন পিস্তল আটকে যায়। ফলে আর গুলি করতে পারেনি। পরে সোহাগ উদ্দিন রানা ছুরি দিয়ে সাগরের গলায় আঘাত করে হত্যা করে। এরপর রানা ও নাছির দু’জন দু’দিকে পালিয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হত্যাকাণ্ডের পরপরই রহস্য উদ্ঘাটনে অভিযানে নামে পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) তানভীর সালেহীন ইমনের নেতৃত্বে ও কোতয়ালী মডেল থানার ওসি আবু সালাম মিয়ার তত্ত্বাবধানে অভিযান চালায় জেলা ও গোয়েন্দা পুলিশের দুটি টিম।

এরই প্রেক্ষিতে হত্যাকাণ্ডের ৩৬ ঘন্টার মধ্যেই শুক্রবার রাতে ঢাকার কমলাপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় মামলার মূল আসামি রানাকে। অপর আসামি নাসিরকেও অচিরেই গ্রেফতার করা হবে বলে জানিয়েছে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবির) আলমগীর হোসেন এ তথ্য জানান।

তিনি জানান, গ্রেফতারকৃত রানাকে জ্ঞিাসাবাদের জন্য রিমান্ড চেয়ে আদালতে প্রেরণ করা হবে।

এসময় সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) তানভীর সালেহীন ইমনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।

উল্লেখ্য, বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় কুমিল্লা শহরের একটি ছাত্রাবাসে সাগরকে গলাকেটে হত্যা করা হয় এবং একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্বক আহত হয় সজিব নামে আরেক ছাত্র। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি পিস্তল ও ছুরি উদ্ধার করে।

কুমিল্লা মহানগরীর রেইসকোর্স এলাকার মফিজ উদ্দিন সড়কের তিনতলা এই বাড়িটির মালিক কিরণময় ভৌমিক আর হিরণময় ভৌমিক নামে দুই ভাই। তারা তিনতালায় থাকেন। বাড়ির নিচতলার ফ্ল্যাটে তিন রুমে ছয় ছাত্র মেস করে থাকতেন।

ঘটনার দিন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভির সালেহীন ইমন পরিবর্তন ডটকমকে জানিয়েছেন, ছাত্রাবাসের এক সদস্যের বোনের সঙ্গে অপর এক সদস্যের প্রেম সংক্রান্ত বিষয়ে মঙ্গলবার রাতে কথা কাটাকাটি হয় বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। আর এ ঘটনার জের ধরেই খুনোখুনি হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ