ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সাধারণ গ্রাহকের প্রায় শত কোটি টাকার আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে ভারতে পালিয়েছেন চৌদ্দগ্রামের পাঁচ স্বর্ণ ব্যবসায়ী। প্রত্যেকেই ভারতে নিজস্ব বাড়িতে অবস্থান করে নতুন করে স্বর্ণ ব্যবসা করছেন বলে জানা গেছে।

পালিয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের দায় দায়িত্ব নিতে নারাজ স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতি। হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা ও স্বর্ণ পাচার করে বাড়ি-গাড়ি করেছেন একাধিক ব্যবসায়ী। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের এমন প্রতারণা থেকে বাঁচতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অনসুন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষে ও ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত চৌদ্দগ্রাম বাজার। দীর্ঘদিন ৩৮জন ব্যবসায়ী নামমাত্র ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে স্বর্ণ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। প্রত্যেকে প্রলোভন দেখিয়ে স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেকের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করে। এছাড়াও চড়া সুদের মাধ্যমে গ্রাহকের থেকে স্বর্ণ বন্ধক রাখেন। এ হিসেবে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছেন। অনেকে আমানতের টাকা ফেরত চাইলে ব্যবসায়ীরা নানা টালবাহানা করেন। বেশির ভাগ গ্রাহক প্রবাসীদের স্ত্রী হওয়ায় প্রতিবাদ করতে পারে না।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত গ্রাহকের প্রায় ৯৪ কোটি টাকার আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পাঁচ স্বর্ণ ব্যবসায়ী আত্মগোপন করেন। পালিয়ে যাওয়া আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন পিংকি জুয়েলার্সের মালিক গোবিন্দ বণিক, জলিল জুয়েলার্সের জাকির, শ্রী দুর্গা জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জিত বণিক, অর্পা জুয়েলার্সের মালিক অলক ও জয় জুয়েলার্সের মালিক সুমন দত্ত। গোবিন্দ বণিক প্রায় ৫০ কোটি টাকা, জাকির ১৫ কোটি, রঞ্জিত বণিক ২০ কোটি, অলক ৫ কোটি, সুমন দত্ত ৪ কোটিসহ মোট ৯৪ কোটি টাকার আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে পালিয়ে যাওয়া জাকির ঢাকায় অবস্থান করছেন। ইউরোপে পাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোটি কোটি টাকা আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে মজুদ রেখেছেন আরো ছয় ব্যবসায়ী। তারা হলেন অর্পন জুয়েলার্সের মালিক মানিক দে, দত্ত জুয়েলার্সের মালিক কৃষ্ণা, ফ্যাশন জুয়েলার্সের মালিক টুটুল বণিক, সুমন জুয়েলার্সের মালিক সুশান্ত, সজিব জুয়েলার্সের মালিক সজিব ও ভাই ভাই জুয়েলার্সের মালিক তরুন। অপরদিকে, ভারতে টাকা পাচার করে সুশেন জুয়েলার্সের মালিক ভারতের বেলগুড়িয়ায় দু’টি বাড়ি, শিলিগুড়িতে দুই ও আগরতলায় একটি ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন। বিশ্বজিৎ বণিক আগরতলা থেকে দু’টি বাড়ি, তার ভাই চন্দ্র বণিক একটি বাড়ি তৈরি করেছেন। তদারকি করেন মিন্টু জুয়েলার্সের পিন্টু দাস। তারও ভারতের আগরতলায় আলিশান বাড়ি ও ঢাকা-চট্টগ্রামে একাধিক ফ্ল্যাট এবং গাড়ি আছে বলে জানা গেছে।

পিংকি জুয়েলার্সের প্রতারণার শিকার যুবনেতা জসিম উদ্দিন, প্রবাসী শফিকুর রহমান, শ্রী দূর্গা জুয়েলার্সের প্রতারণার শিকার জামাল উদ্দিনসহ অনেক ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের বলেন, স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করে লাখ লাখ টাকা আমানত রাখি। হঠাৎ করে তারা দোকানে তালা মেরে উধাও হয়েছেন। পরে জানতে পারি আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে তারা ভারতে চলে গেছেন। এব্যাপারে চৌদ্দগ্রাম বাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নরেশ বণিক দায়-দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, এতে স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতি জড়িত নয়। গ্রাহকেরা নিজের ইচ্ছাতে সমিতিকে না জানিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের নিকট আমানত ও স্বর্ণ বন্ধক রেখেছে।

এতে আমাদের কিছু করার নেই। বাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা উধাও হয়ে যাওয়ায় জনগণের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ যদি আইনের আশ্রয় নিতে যায়, আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করবো। এবিষয়ে পৌর মেয়র মিজানুর রহমান বলেন, স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা যেভাবে গ্রাহকের আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, এতে জনমনে ব্যাপক সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারের নির্দেশনা ছাড়া যাতে গ্রাহকেরা জুয়েলারী ব্যবসায়ীদের নিকট কোন আমানত জমা না রাখে।

চৌদ্দগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, ভুক্তভোগীদের কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এব্যাপারে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক আবুল ফজল মীর বলেন, ভুক্তভোগী কোন গ্রাহক সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।