ডেস্ক রিপোর্টঃ কুষ্টিয়ায় এক কলেজ ছাত্রীকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ের পর মাথার চুল কেটে দিয়ে ফেসবুকে নগ্ন ছবি আপলোড করার অভিযোগে প্রতারক স্বামী নাজমুল হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে নির্মম জবানবন্দি দিয়েছে নাজমুল হোসেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তাকে ব্ল্যাকমেইল করে আমার দখলে রাখতে গোপন ক্যামেরায় তার নগ্ন ছবি ও ভিডিও ধারণ করি। এসব নগ্ন ছবি ও ভিডিওর ভয় দেখিয়ে আজীবন তাকে বাধ্য করে রাখতে চেয়েছিলাম।

এর আগে সোমবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নাজমুলকে করা হয়। রাতেই নাজমুলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ছিনিয়ে নেয়া স্ত্রীর মোবাইল ও নাজমুলের ব্যক্তিগত মোবাইল জব্দ করে পুলিশ। এছাড়া, যে মোবাইল দিয়ে স্ত্রীর ফেসবুক আইডি থেকে নগ্ন ছবি ও ভিডিও বিভিন্নজনের ফেসবুকে পাঠানো হত সেই মোবাইলটিও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।

ভুক্তভোগী স্ত্রী মামলায় উল্লেখ করেন, চার বছর আগে পৌর এলাকার জুগিয়া হাট পাড়ার রফিকুল ইসলামের ছেলে নাজমুল হোসেন আমাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত। অনেক বকাঝকা করেছি কিন্তু সে আমার পিছু ছাড়েনি। একপর্যায়ে নাজমুলের সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর নাজমুল আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল এলাকার স্থানীয় এক কাজির কাছে নিয়ে যায়।

এ সময় নাজমুল আমাকে বলে, আমি মুসলমান তোমাকেও মুসলমান হতে হবে। মুসলমান পরিচয় জানতে পেরে নাজমুলকে বিয়ে করতে এবং ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকৃতি জানাই আমি। এ সময় নাজমুল এবং তার সঙ্গে থাকা অজ্ঞাত তিন-চারজন আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক দুটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় এবং নোটারি পাবলিক দিয়ে মুসলমান হিসেবে হলফনামা আদায়ের পর বিয়ে সম্পন্ন করে।

একপর্যায়ে তার অত্যাচারে বাধ্য হয়ে বিয়ে মেনে নিয়ে সংসার শুরু করি। শহরের ছয় রাস্তার মোড়ের পাশে এবং জেলখানা মোড়ে বাসা ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করতে থাকি আমরা।

বিয়ের কাবিননামায় আমার বাবার নাম সুজন রাজবংশী পাল্টে লেখা হয় শেখ ইমতিয়াজ আলী এবং মায়ের নাম মালা রাজবংশীর পরিবর্তে লেখা হয় আফরোজা বেগম মালা।

কিন্তু বিয়ের এক বছর পর আমি জানতে পারি নাজমুল বিবাহিত, তার দুটি সন্তান রয়েছে। সেই সঙ্গে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সে। এসব বিষয়ে নাজমুলকে জিজ্ঞাসা করলে শুরু হয় আমার ওপর নির্যাতন। শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা চরমে পৌঁছালে বাবার বাড়ি চলে আসতে বাধ্য হই।

গত ২৬ জুন বেলা ১১টার দিকে নাজমুল মোটরসাইকেল নিয়ে আমাদের বাড়ি আসে। এ সময় নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায় সে। পরে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহলবাড়ীয়া সাতবাড়ীয়া মাঠের মধ্যে নিয়ে আমাকে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে আমার মাথার চুল কেটে দেয়। একই সঙ্গে আমার মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। আমার চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে নাজমুল পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন আমাকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসে।

এরপর থেকে আমি ও আমার পরিবারকে হুমকি দিচ্ছিল নাজমুল। কোনো ধরনের আইনের আশ্রয় নিলে খবর আছে বলেও হুমকি দেয়। ঘটনার কয়েকদিন পর আমার আত্মীয়-স্বজনসহ পরিচিতজনদের ফেসবুকে তার সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও পাঠায়। সেই সঙ্গে অনেক নগ্ন ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে ছেড়ে দেয়।

এ ঘটনার ব্যাপারে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন জানান, সোমবার নাজমুলের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তার স্ত্রী। কুষ্টিয়া মডেল থানায় পর্নগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২-এর ৮ ধারায় মামলাটি করা হয়। সোমবার আদালতের মাধ্যমে নাজমুলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ওসি নাসির উদ্দিন জানান, নাজমুল ভয়ঙ্কর প্রতারক। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নাজমুল জানিয়েছে, ওই মেয়ে সুন্দরী হওয়ায় নিজেকে হিন্দু এবং অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে। একপর্যায়ে মেয়েটিকে ধর্মান্তরিত করে বিয়েতে বাধ্য করে। ঘরে স্ত্রী-সন্তান থাকায় অন্যত্র বাসা ভাড়া না নিয়ে ওই মেয়ের সঙ্গে সংসার করে নাজমুল। পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী গোপন ক্যামেরায় মেয়েটির নগ্ন ছবি ও গোসলের ভিডিও ধারণ করে নাজমুল। এমনকি দুইজনের শারীরিক সম্পর্কের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নিজের কাছে রেখে দেয়। নগ্ন ছবি এবং ভিডিও ধারণের জন্য মেয়েটিকে মাঝে মধ্যে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হত। এসব নগ্ন ছবি ও ভিডিওর ভয় দেখিয়ে মেয়েটিকে নির্যাতন করত নাজমুল।

ওসি আরও জানান, বাগে আনতে না পেরে শেষ পর্যন্ত চরিত্রহীন হিসেবে প্রমাণ করার জন্য মেয়েটিকে মারপিট করে মাথার চুল কেটে দেয়। ভয়ভীতি এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ওই মেয়ের নগ্ন ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে ছেড়ে দেয় নাজমুল। নিজেকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রাখতে মেয়েটির মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে তার ফেসবুকের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে ফেলে। ওই ফেসবুক থেকে মেয়েটির আত্মীয়-স্বজনদের ফেসবুকে নগ্ন ছবি ও ভিডিও পাঠায় নাজমুল।