মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। এ কথাটি হয়তো ভুলে যান অনেক ছেলেমেয়েই কিংবা ভুলে থাকতে চান। অথচ সন্তানের সঙ্গে শেষ বয়সটা কাটানোর জন্যই তিল তিল করে একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তোলেন মা-বাবা।

কিন্তু এ সুখ সব মা-বাবার কপালে জোটে না। ছোটখাটো কারণ দেখিয়ে আপন নিবাস থেকে তাদের বের করে দেয় পাষণ্ড সন্তান। এবার এমনই এক ঘটনা ঘটেছে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল ৩ নং ওয়ার্ডে।

স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিজের তিনতলা অট্টালিকায় থাকেন মরিয়ম বেগমের একমাত্র ছেলে কিরন শিকদার। কিন্তু মরিয়ম বেগমের স্থান ওই তিনতলা ভবনে হয়নি।

পাশের মহল্লায় একটি টিনের ঘরে স্থান হয়েছে নবতিপর এই বৃদ্ধার। স্ত্রী চান না বলে ছেলে মাকে নিজের কাছে রাখতে পারেন না বলে মরিয়ম বেগমের ভাষ্য।

ঘরের ভিতর একটি পুরনো তোশক, আর দুই চারটি থালা-বাসন ছাড়া আর কিছুই নেই। আর এই অন্ধকার ঘরেই একা একা দিন পার করছেন এই বৃদ্ধা মা। বৃদ্ধার বড় ছেলে কিরণ শিকদারের পলাশে সাজ ডেকরেটর নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

জানা যায়, ঘোড়াশালের ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মরিয়ম বেগম। বয়সের ভারে লাঠিতে ভর দিয়ে টুকটাক হাঁটাচলা করেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। স্বামী প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেছেন। বড় ছেলে কিরণ শিকদার ঘোড়াশাল পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। পাশাপাশি সাজ ডেকোরেটর নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক। পলাশবাজার এলাকায় নিজের তিনতলা রাজকীয় বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন কিরণ। কিন্তু স্ত্রীর কথামতো গর্ভধারিণী বৃদ্ধ মাকে গত রমজানে নতুনবাজার এলাকার গফুর মিয়ার ভাঙা একটি ঘরে রেখে যান তিনি। সেই থেকে শতবর্ষী এ বৃদ্ধার দিনরাত কাটছে প্রতিবেশীর অন্ধকার ভাঙা ঘরে। একটি পুরনো তোশক, দু-চারটি থালাবাসন ছাড়া কিছুই নেই সে ঘরে। তবে ইচ্ছে ছিল ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে জীবনের শেষ সময়টা সুখে ও শান্তিতে কাটাবেন।

>>আরো পড়ুনঃ  মোস্তাফিজের বউভাতে এলাহি কারবার

মরিয়ম বেগম বলেন, ‘ছেলের বউ আমাকে তাদের সঙ্গে রাখতে চায় না। তাই আমাকে এখানে রেখে গেছে ছেলে। মাঝেমধ্যে এসে বাজার সদাই করে দিয়ে যায়। তা দিয়েই অন্ধকার ভাঙা ঘরে দিন কাটে আমার। আসলে জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে অনেক কিছু চাওয়ার থাকলেও এখন কিছুই করার নেই আমার, আজ আমি অসহায়। আমার ইচ্ছা ছিল জীবনের শেষ সময়ে সন্তান, নাতি-নাতনিকে নিয়ে হাসিখুশিতে দিন কাটাব। কিন্তু কপালে আমার সেই সুখ নেই। আমার ছেলের ইচ্ছা থাকলেও স্ত্রীর জন্য পারে না। আমাকে তাদের সঙ্গে রাখার কথা শুনলেই স্ত্রী লিপি আক্তার ঝগড়া করে।’

তিনি বলেন, ‘এখানে আসার আগে চলনা এলাকার গ্রামের বাড়িতে একা একা দিন কাটিয়েছি আমি। তার পর ছেলে বলল আমাকে তার কাছে নিয়ে যাবে। ভাবছিলাম তার বাড়িতে তুলবে। পরে দেখি আমাকে এখানে ঘর ভাড়া করে দিয়েছে। এখানে ছেলে এসে খোঁজখবর নিলেও ছেলের বউ, নাতি-নাতনি কেউ আসে না। তারা খোঁজখবরও নেয় না। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর সেও খোঁজখবর নেয় না। আমি এখন সন্তানদের কাছে বোঝা হয়ে গেছি। মাঝেমধ্যে খুব একাকিত্ব লাগলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে সময় পার করি।’

>>আরো পড়ুনঃ  ২৭ বছর পর ফাইনালে ইংল্যান্ড

মরিয়ম বেগম আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছি। চিকিৎসা না করায় প্রায় ১০ বছর আগে বাম পাশের চোখ নষ্ট হয়ে যায়। এখন ডান পাশের চোখেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। হয়তো এটিও নষ্ট হয়ে যাবে। বলতে গেলে আমি এখন অন্ধ।’

দিনা বেগম নামের প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া বলেন, ‘রমজান মাসে বৃদ্ধ মরিয়ম বেগমকে তার ছেলে এখানে রেখে গেছেন। শোবার জন্য ঘরে ছোট একটি ভাঙা চৌকি দিয়েছিল। সেটি ছিল ছারপোকায় খাওয়া। পরে ওই চৌকিও সরিয়ে ফেলা হয়। মরিয়ম বেগম এখন মাটিতে ঘুমান। এমন একজন বৃদ্ধা মাকে এভাবে একা অন্ধকার ঘরে রাখা খুবই অমানবিক। শুনেছি ছেলের বউ নাকি তাদের কাছে রাখতে চায় না। বউয়ের কথায় এখানে বৃদ্ধা মাকে ফেলে গেছেন ছেলে। মরিয়ম বেগমের রান্নাবান্না, কাপড়-চোপড় ধোয়া থেকে শুরু করে সব কাজই আমরা করে দিই।’

>>আরো পড়ুনঃ  ক্ষোভে টিভি ভাঙছেন ভারতীয় সমর্থকরা!

বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর সেটি নরসিংদী পুলিশ সুপারের নজরে এলে তিনি বৃদ্ধার ছেলে কিরণকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। পরে পলাশ থানা পুলিশ গতকাল রবিবার দুপুরে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে আটক করে।

এ ব্যাপারে পলাশ থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বলেন, বৃদ্ধা মাকে নির্জন অন্ধকার ঘরে ফেলে রাখার ঘটনায় তার ছেলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, খবর প্রকাশ করায় তার স্ত্রী এক সাংবাদিককে হুমকি দিয়েছেন মর্মে সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এটিও তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ