ডেস্ক রিপোর্টঃ পৌনে দুই শতাব্দী পেরিয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কুমিল্লা জিলা স্কুল। মানবিক গুণসম্পন্ন বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে এই বিদ্যালয়টি। এ প্রতিষ্ঠানের অনেক কৃতী ছাত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, চিকিত্সক, বুদ্ধিজীবী ও দেশবরেণ্য আলোকিত মানুষ হিসেবে। প্রতিবছর বালক বিদ্যালয়টি পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণসহ নানা পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠানের গৌরব অক্ষুণ্ন রাখছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৮৩৭ সালের ২০ জুলাই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। ‘কুমিল্লা সরকারি স্কুল’ নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির বর্তমান নামই ‘কুমিল্লা জিলা স্কুল’। স্যার হেনরি জর্জ লেজিস্টার (এইচ.জি. লেসিস্টার) এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এর আগে তিনি ত্রিপুরা জেলা কালেক্টরেট অফিসের প্রধান করণিক ছিলেন। ত্রিপুরার মহারাজ ধর্মমানিক্যের খননকৃত নগরীর ধর্মসাগরের পূর্বপাড়ের দক্ষিণাংশে ওইসময় একটি বাংলো ঘরে ৩৭ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয়েছিল স্কুলটির প্রথম পাঠদান। শুরুতে স্কুলের ব্যবস্থাপনায় রাখা হয় পাঁচজন ইউরোপিয়ান, তিনজন মুসলমান ও একজন হিন্দু ব্যক্তিকে। ১৮৩৯ সালের ৬ মে এইচ.জি. লেসিস্টারকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয় শাসক ব্রিটিশ সরকার। শুরুতে প্রধান শিক্ষকসহ এ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন পাঁচজন। ১৮৩৯ সালে এ স্কুলের ছাত্রসংখ্যা ছিল ৭৬ জন এবং ধীরে ধীরে এ সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৮৫৭ সালে স্কুলটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যায়। ওইসময় স্কুলের ছাত্রদের লেখাপড়ায় উত্সাহ দেওয়ার লক্ষ্যে ত্রিপুরার মহারাজা মেধাবী ছাত্রদের জন্য দুটি এবং জমিদার রাজা সত্যচরণ ঘোষাল একটি বৃত্তি প্রদান করেন। ১৮৭০ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু এইচ.জি লেসিস্টার দক্ষতার সাথে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত ৫২ জন শিক্ষক কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

শহরের কেন্দ্রবিন্দু কান্দিরপাড় এলাকায় ধর্মসাগরের পূর্বপাড়ে, বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তনের উত্তরে ও ভাষা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামের দক্ষিণ পাশে মনোরম পরিবেশে এ বিদ্যাপীঠটি অবস্থিত। ৫.৬৯ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির ভৌত অবকাঠামো কালপরিক্রমায় আজকের রূপ লাভ করেছে। আশির দশকে স্কুলের বর্তমান প্রশাসনিক ভবনটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এখানে রয়েছে মেঘনা, গোমতি, তিতাস নামের তিনটি একাডেমিক ভবন, প্রধান শিক্ষকের বাসভবন, পাঁচশ’ আসনের একটি অডিটরিয়াম, একটি সুদৃশ্য মসজিদ, একটি ছাত্রাবাস, দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন স্থাপনা, বিশাল মাঠের পাশে বিভিন্ন জাতের ফুলের গাছ ও সুশোভিত বৃক্ষরাজি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটি শিফটে স্কুলটিতে একাডেমিক কার্যক্রম চললেও সময়ের চাহিদার কারণে ১৯৯১ সাল থেকে দুই শিফট (প্রভাতি ও দিবা) চালু করা হয়।

বর্তমানে এ স্কুলে প্রধান শিক্ষক, দুইজন সহকারী প্রধান শিক্ষক ও ৫০ জন সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে। এরমধ্যে সহকারী প্রধান শিক্ষকের একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দুই শিফটে পরিচালিত এ স্কুলের বর্তমান ছাত্রসংখ্যা ২০৫০ জন। জেএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে ২০১৫ সালে চারশ’ জনের মধ্যে ৩৭৪ জন ও ২০১৬ সালে ৩৭৬ জনের মধ্যে ৩৩২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় ২০১৬ সালে ৩৫২ জনের মধ্যে ২৮৮ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ স্কুলে রয়েছে ২০টি কম্পিউটারসহ একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব। এ স্কুলের আইটি শিক্ষক মাসুদ পারভেজ ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করে ২০১০ সালে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন রাশেদা আক্তার এম.এ, এম.এড, বিসিএস (সা.শি.)। তিনি বলেন, ‘দেশের অন্যতম প্রাচীন এ বিদ্যাপীঠ জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার এক অনন্য আলোকবর্তিকা। লেখাপড়া ও ভাল ফলাফলের পাশাপাশি সৃজনশীল মেধা প্রতিযোগিতায় ২০১৬ সালে দেশের মধ্যে এ স্কুলের দু’জন ছাত্র শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে এবং তারা থাইল্যান্ডে সাতদিনের শিক্ষা সফর করেছে।

একই বছরে দশম শ্রেণির ছাত্র নিহাল জোহায়ের পরশ বাংলাদেশ থেকে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করে ইন্দোনেশিয়া থেকে ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালে স্কাউটে দশম শ্রেণির দু’জন ছাত্র প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং কাব স্কাউটে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক দু’জন ছাত্র শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। এছাড়া এ স্কুলের ছাত্ররা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, রচনা, চিত্রাঙ্কন, বিতর্ক, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জেলা, আঞ্চলিক, বিভাগীয়, জাতীয় পর্যায়ে কৃতিত্বের ধারা অব্যাহত রেখেছে।’