কক্সবাজারের চকরিয়ায় একটি বাড়ির দরজার সামনে বসে কোরআন পাঠ করছিলেন ইকবাল হোসেন। এলাকাবাসী তাঁকে রোহিঙ্গা ভেবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দেন। ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ। পুলিশ তাঁকে পাগল ভেবে ছেড়ে দেয়। এ ঘটনা ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যার। পরে ২১ অক্টোবর রাতে কক্সবাজার থেকে তাঁকে আটক করে কুমিল্লা জেলা পুলিশ। ওই ঘটনার একটি ভিডিও এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।জানতে চাইলে কক্সবাজারের চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার তফিকুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিষয়টি তিনি পরে জেনেছেন। চকরিয়া থানার ওসি ঘটনা তদন্ত করে দেখছেন।

এদিকে সিআইডির কুমিল্লা জেলার বিশেষ পুলিশ সুপার খান মোহাম্মদ রেজোয়ান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও কোরআন অবমাননার মামলার তদন্ত সিআইডিকে দেওয়া হয়েছে। কার ইন্ধনে ইকবাল মণ্ডপে কোরআন রেখেছে, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আজকের পত্রিকার হাতে আসা পৌনে তিন মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কাঁধে একটি লাল গামছা। আধো-আলোতে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন ইকবাল। তাঁর কাছে একজন জানতে চান বাসা কোথায়। ইকবাল বলেন, তাঁর বাড়ি কুমিল্লা। গন্তব্য জানতে চাইলে কক্সবাজার গিয়ে একটি হোটেলে চাকরি করবেন বলে উত্তর দেন। পরে লোকজন তাঁকে কক্সবাজারের গাড়িতে তুলে দেয়।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে ইকবাল বলেছেন, তিনি চাননি নানুয়াদিঘির পাড়ে পূজা হোক। তাই তিনি একটি কোরআন এনে মণ্ডপে রাখেন। ইকবাল বলেন, তিনি দারোগাবাড়ি জামে মসজিদ থেকে কোরআন নিয়ে মণ্ডপে রেখে হনুমানের গদা নিয়ে আবার মসজিদে চলে যান। মসজিদের সামনের পুকুরে গদাটা ফেলে দিয়ে তিনি ঘুমাতে যান। কিন্তু ঘুম আসছিল না। উঠে দেখেন গদা পানিতে ভাসছে। সেখান থেকে তুলে মসজিদের সামনের পুকুরের দক্ষিণ পাশে জঙ্গলে ফেলে দেন। ফজর নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে যান। সকাল ৮টার দিকে হইচই শুনে তিনি নানুয়াদিঘির পাড় মণ্ডপে যান। বেলা ১১টার দিকে তিনি মিছিলে যোগ দেন। দুপুরে মিছিলে দেখতে পান জুবায়ের নামে এক যুবককে। জুবায়েরকে দেখে তিনি ভয় পান। ভিড়ের মধ্যে তাঁকে খুন করে ফেলতে পারে বলে ধারণা হয় ইকবালের। কারণ, জুবায়েরই ১০ বছর আগে তাঁর পেটে ছুটি মেরেছিল। পরে তিনি ভিড় থেকে বের হয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ইকবালের দেওয়া তথ্যমতে রোববার দিবাগত রাতে হনুমানের সেই গদা উদ্ধার করে পুলিশ।
জুবায়েরের ব্যাপারে ইকবালের মা বিবি আমেনা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ১০ বছর আগে মারধরের পর ইকবালের পেটে ছুরিকাঘাত করেছিল জুবায়ের। সেই মারধরের পর থেকে ইকবাল পাগলামি করত।

মণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়া নিয়ে ১৩ অক্টোবর সকাল থেকেই উত্তপ্ত কুমিল্লা। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, বিকেল সাড়ে ৩টায় কর্ণফুলী ট্রেনে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যান ইকবাল। রাতে চট্টগ্রাম নামেন। সারা রাত চট্টগ্রাম স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় কাটিয়ে দেন। পরদিন একটি ট্রাকে উঠে চকরিয়ায় নামেন।

সেখানে একটি মাদ্রাসা থেকে কোরআন শরিফ নেন। সন্ধ্যার দিকে কোরআন বের করে একটি বাড়ির সামনে পড়ছিলেন। লোকজনের সন্দেহ হলে ৯৯৯-এ কল দেয়।

চারপাশে মানুষের ভিড় জমে। তবে তখনো ইকবালের ছবি ভাইরাল হয়নি। ফলে লোকজন জানতে পারেনি এই ব্যক্তি কে।

পরে হেঁটে এবং কয়েকটি বাস বদল করে ১৯ অক্টোবর মঙ্গলবার কক্সবাজার পৌঁছান ইকবাল। সেখানে একটি মাদ্রাসায় গিয়ে খাবার চান। খেয়ে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন। এরপর সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে গিয়ে তিন তরুণের সঙ্গে পরিচয় হয় ইকবালের। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে ইকবালকে দেখে তরুণদের সন্দেহ হয়। কুমিল্লার নানুয়াদিঘির পাড় পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে এই যুবকের মিল দেখতে পান তাঁরা। তরুণদের মধ্যে একজনের বড় ভাই নোয়াখালী জেলার পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি তাঁর ভাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি জানান। এরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ইকবালকে আটক করে।

১৩ অক্টোবর সকালে ফেসবুকে লাইভ করে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন স্থানীয় যুবক ফয়েজ আহমেদ। আদালতে ১৬৪ ধারায় ফয়েজের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার দিন সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন ফয়েজ আহমেদ। নানুয়াদিঘির পাড়ে পুলিশ ও জনগণের ভিড় দেখে মণ্ডপের কাছে যান। এ সময় দেখেন কয়েকজনের সঙ্গে পুলিশের বাগ্‌বিতণ্ডা হচ্ছে। কোরআন মণ্ডপে রেখে এবং সেই কোরআন উদ্ধার করে গাড়ির সিটে রেখে অসম্মান করা হয়েছে বলে তারা হইচই করে। প্রায় ২০ বছর সৌদি আরবে থেকে সম্প্রতি দেশে আসা ফয়েজ অতি-উৎসাহী হয়ে ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভ করেন।

ইকবাল নেশাগ্রস্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন ইকবালের মা বিবি আমেনা। সোমবার দুপুরে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ইকবাল গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের নেশায় আসক্ত ছিলেন। প্রায় এক যুগ আগে তাঁকে বিয়ে করানো হয়। কিন্তু নেশাগ্রস্ত হওয়ায় স্ত্রীকে মারধর করতেন। এর মধ্যে জুবায়ের পেটে ছুরিকাঘাত করার পর তাঁর পাগলামি শুরু হয়। পাঁচ বছর আগে স্ত্রী তাঁকে তালাক দিয়ে চলে যান। বছর না ঘুরতেই আবার বিয়ে করান। সেই বউও এক বছর আগে চলে গেছেন।

সূত্রঃ আজকের পত্রিকা

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: