কুমিল্লার বাহার বললেই তাকে সারা দেশ চেনে। মানে আওয়ামী লীগের আ ক ম বাহার উদ্দিন বাহার। ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের ব্র্যান্ড নেইম এরা। এদের মন্ত্রীও হতে হয় না। পদ-পদবিরও প্রয়োজন পড়ে না কখনোসখনো। যদিও তিনি এখন কুমিল্লা মহানগরী আওয়ামী লীগের সভাপতি। তবু এরাই একেক এলাকার নেতা। আরেকজন বীর ছিলেন অধ্যক্ষ আফজল খান। আওয়ামী লীগের লড়াকু এক তেজস্বী নেতা। বুক দিয়ে কর্মীদের আগলে রাখতেন। দলের জন্য লড়তেন। এখন সেই তেজ নেই। তার কন্যাকে মেয়র পদে বঙ্গবন্ধুকন্যা মনোনয়ন দিয়েছিলেন। এবার সংরক্ষিত আসনে এমপি করেছেন। বাহার-আফজলরা আগলে রাখেন দলের নেতা-কর্মী, এক কথায় দলকে। এদের সংখ্যা কমে গেছে সারা দেশে। অনেকের মৃত্যুতে আর নতুন নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ায় এদের আকাল। সারা দেশে এখন কর্মীবান্ধব গণমুখী আন্দোলন-সংগ্রামের সিঁড়িপথে এবং দলের নানা স্তর অতিক্রম করে মাঠ কাঁপানো নেতারা জন্ম নেন না। একেক এলাকায় ব্র্যান্ড আওয়ামী লীগার হয়ে শক্ত পিলারের মতো দাঁড়িয়ে আছেন, বিগত দিনের মতো এখন তা দেখা যায় না। এ না দেখাটাই বলে দেয় আওয়ামী লীগ কতটা নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগছে। একসময় কর্মীবান্ধব গণসম্পৃক্ত এমন ব্র্যান্ড আওয়ামী লীগার কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে ছিলেন অসীম সাহস, ত্যাগ আর কমিটমেন্টে। যারা জন্মেছিলেন আওয়ামী লীগে, অনেকে ছাত্রলীগ-যুবলীগ হয়ে আওয়ামী লীগ নেতা হয়েছিলেন। যাক, আমি বাহারনামা লিখতে বসিনি। কখনো তার সঙ্গে দেখাও হয়নি। আমি সম্প্রতি কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের নবনির্মিত আধুনিক ডিজিটাল কার্যালয়ের উদ্বোধনকালে ভিডিও কনফারেন্সে কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা আ ক ম বাহারের কথোপকথন নিয়ে লিখতে বসেছি। আমার কাছে এ কথোপকথনে মনে হয়েছে এখনো রাজনীতিতে নেতা-কর্মীর সম্পর্ক শেষ হয়নি। এখনো এখান থেকে নেতা-কর্মীদের শেখার আছে। নিজেকে তৈরি করার সুযোগ আছে।

এখনো দলের নেতার সঙ্গে তৃণমূল নেতা যে আর্গুমেন্ট বা নিজের এলাকার স্বার্থে বা মাঠকর্মীদের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে যুক্তিতর্ক নির্ভয়ে করা যায় তার চিত্র হারিয়ে যায়নি। নেতৃত্বের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা নিঃশর্ত আনুগত্য ও আবেগ-অনুভূতি রেখে ব্যক্তিত্ব নিয়ে যে কথা বলা যায় দেশবাসীর সামনে তা সেদিন দৃশ্যমান হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, দলের সভানেত্রীও যে তাঁর তৃণমূলের একজন পোড় খাওয়া নেতাকে গভীর স্নেহে তার বক্তব্য আবদার ও যুক্তি উপস্থাপন করার সুযোগ দিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে শুনে জবাব দেন পাল্টা যুক্তিতে, তা-ও পরিষ্কার হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে তাঁর নেতা সোহরাওয়ার্দী যেমন যুক্তিতর্ক করতে দিতেন তেমনি তিনিও নেতা-কর্মীর কথা শুনতেন। নেতা-সংগঠক তৈরি করতেন। বঙ্গবন্ধুকন্যাও দেন। কিন্তু যারা নিজের স্বার্থে ডুবে থাকেন তারা কর্মী-দল ও মানুষের কথা তাদের নেত্রীকে বলেন না যুক্তি দিয়ে। এটা রাজনীতি নয়। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাণ। জনগণের শক্তিতে জন্ম নেওয়া বৃহত্তম দলের প্রাণশক্তি তার দলীয় সংস্কৃতির উত্তরাধিকারিত্ব। এর চর্চা বন্ধ করলে বন্ধ্যত্ব তৈরি হবে। সেদিনের কথোপকথনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ দেখেছেন। তবু সেটি উপস্থাপন করে আমরা বিশ্লেষণে যেতে পারি। রাজনীতিটা আসলে এমনই ছিল।

সেদিনের কথোপকথন ছিল এমন- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিভাগের বিষয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি দুটি বিভাগ বানাব দুটি নদীর নামে। একটি হবে পদ্মা, অন্যটি মেঘনা। এ দুই নামে বিভাগ করতে চাই।’
এ সময় আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, ‘আপা, আমি একটি কথা বলতে চাই।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মিত হেসে বলেন, ‘হুম, বল।’

আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, ‘আপা, কুমিল্লা নামে দেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘না, আমি এ “কু” নামে দেব না।’

জবাবে বাহার বলেন, ‘না আপা, কুমিল্লার নামে দেন।’

জবাবে প্রধানমন্ত্রী আবারও বলেন, ‘আমি তোমার কুমিল্লার নামে দেব না। কারণ, তোমার কুমিল্লার নামের সঙ্গে খুনি মোশতাকের নাম জড়িত।’

আ ক ম বাহার আবারও বলেন, ‘না আপা, কুমিল্লার নামে দেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নো, আমি কুমিল্লার নামে দেব না। কুমিল্লার নাম নিলেই মোশতাকের নাম ওঠে।’

আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, ‘আপা, কোনো কুলাঙ্গারের নামে দেশের পরিচয় হয় না। বাংলাদেশের পরিচয় বঙ্গবন্ধুর নামে, মোনায়েম খানের নামে না। যখন বাংলাদেশের নাম চিনত না, তখন সবাই শেখ মুজিবের দেশ বলত। কোনো কুলাঙ্গারের নামে এ দেশ পরিচিত না।’ বাহার বলেন, ’৮৮ সাল থেকে আমি কুমিল্লা বিভাগের আন্দোলন করে আসছি, সংসদে আমিই একমাত্র যে বিভাগ চেয়েছি। আপা, আমি কুমিল্লা বিভাগের আন্দোলন করি বিভাগ হয় সিলেট, রংপুর, বরিশাল। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাহার থামো, আমি যদি কুমিল্লার নামে দিই তাহলে চাঁদপুর বলবে তাদের নামে, নোয়াখালী বলবে তাদের নামে দেওয়ার জন্য। কুমিল্লা তো ত্রিপুরার একটি ভগ্নাংশ।’

জবাবে আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, ‘আপা ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর সবাইকে তাদের নামে দিয়েছেন এতে কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ফরিদপুর বিভাগ করব ‘পদ্মা’ নামে। ফরিদপুরের নামও দিচ্ছি না। আর কুমিল্লা বিভাগ হবে ‘মেঘনা’ নামে।

বাহার আবার বলেন, ‘না আপা, আমাদেরটা কুমিল্লার নামে রাখেন।’ হলরুম-ভর্তি নেতা-কর্মীও তুমুল করতালি দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ নামে অন্য জেলাগুলো আসতে চায় না।’

আ ক ম বাহাউদ্দিন বলেন, ‘কেন আসবে না?’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, লক্ষীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেউ আসবে না।’

আ ক ম বাহার আবারও বলেন, ‘আপা আপনি কি সিলেটে জিজ্ঞাসা করে বিভাগ দিয়েছেন। আপনি দিলে সবাই আসবে, সবাই মানবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নো, তোমাকে দায়িত্ব দিলাম; তুমি রাজি করিয়ে নিয়ে আস। সবার কাছ থেকে লিখিত নিয়ে আস।’

আ ক ম বাহার বলেন, ‘আপা, আপনি বলে দিলে সবাই মানবে। আমার কথা কেউ শুনবে না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নাম দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা ছাত্র অবস্থায় স্লোগান দিয়েছ- “পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার-আমার ঠিকানা; বাংলাদেশ, বাংলাদেশ”।’

বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। বীর মুক্তিযোদ্ধা আমরাই প্রথম বলেছিলাম। আমরা বঙ্গবন্ধুর কর্মী।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসতে হাসতে বলেন, ‘তাহলে তুমি থাকো। যদি বিভাগ চাও তাহলে আমি “মেঘনা” নামে করে দিতে পারি।’

নাছোড়বান্দা আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, ‘আপা করজোড়ে অনুরোধ করছি, কুমিল্লা নামে দেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মেঘনা পার হলেই তো কুমিল্লা, আর পদ্মা পার হয়ে যাব ফরিদপুর।’

আ ক ম বাহাউদ্দিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়; আপা হিসেবে আপনার কাছে দাবি জানাচ্ছি; বঙ্গবন্ধুকন্যা আমাদের ফেরত দেবে না। বঙ্গবন্ধুকন্যা আমাদের ফেরত দিতে পারবে না।’

এ সময় নেতা-কর্মীরা করতালি দিতে থাকেন।

তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমিল্লার উন্নয়নচিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘তোমার মেঘনা সেতু, গোমতী, তিতাস সেতু করে দিয়েছি। সবই তো করলাম। আমি তো বললাম কেউ আসবে না।’

আ ক ম বাহার বলেন, ‘আপা আপনি চাইলে বাংলাদেশে হবে না এমন কিছুই নাই। আপনি চাইলে সবই হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নোয়াখালী চায় তাদের নামে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া চায় তাদের নামে, সবাই সবার নামে চায় এটা দিতে পারব না। চাঁদপুর নাম তো আরও সুন্দর। চাঁদপুর চায় তাদের নামে হোক।’

আ ক ম বাহার বলেন, ‘আপা বঙ্গবন্ধুর আমলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল পার্ট অব কুমিল্লা, চাঁদপুর ছিল পার্ট অব কুমিল্লা। আমাদের ছাত্রলীগের বিশাল একটি অংশ ছিল কুমিল্লার।’

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কুমিল্লার আসল নাম ছিল ত্রিপুরা। এখনো পুরনো কাগজে ত্রিপুরা লেখা আছে। রেজিস্ট্রার দফতরে গিয়ে দেখ ত্রিপুরাই লেখা আছে। ঠিক আছে, তোমাদের প্রস্তাব রাখলাম। পছন্দ হলে ভালো, না হলে কিছু করার নেই।’

জবাবে বাহাউদ্দিন বাহার বলেন, ‘আপা আপনি এভাবে বললে আমরা কার কাছে যাব। কুমিল্লা ত্রিপুরার রাজধানী ছিল।’

জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঐতিহাসিক দুটি নদীর নামে দিচ্ছি। এ নিয়ে আর কোনো কথা নয়। তবে তোমাদের প্রস্তাব রাখলাম।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা সেদিন আরও বলেন, কার্যালয় মহানগরীর হলেও জেলাসহ সবার অফিসই এটা হবে তো? জবাবে বাহার বলেন, আপনি বলেছেন সবাই এ অফিস ব্যবহার করবে, জেলার বাইরের নেতা-কর্মীরাও যদি মিটিং করতে চায় করবে। আপনি একবার অফিসে আসবেন এটা আমাদের অনুরোধ আপা।

একটা সময় ছিল আওয়ামী লীগের মতো বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক দলেই নয়, সব দলেই নেতা-কর্মীরা যে কোনো ইস্যুতে আলোচনা, বিতর্ক করতেন। প্রয়োজনে ওয়ার্কিং কমিটির সভা মুলতবি হতো। ফের আলোচনার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ হতো। দলের বর্ধিত সভায় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হতো। এখনো শেখ হাসিনা উপজেলা নেতাদের কথা বলতে দেন। যারা দলকে ভালোবাসেন, যারা নেতৃত্বকে ভালোবাসেন তারা সত্য তুলে ধরেন। চাটুকার মোসাহেব দাসেরা কেবল সত্য আড়াল করে তেলবাজি করেন। এতে নেতৃত্ব বিভ্রান্ত হন। দলের ক্ষতি হয়। বাহার তো নিজের জন্য বলেননি! দলের স্বার্থে কুমিল্লাবাসীর আবেগ-অনুভূতি চাওয়াটা নিয়ে এত আকুতি করেছেন। আর আওয়ামী লীগে এখনো নেতা-কর্মীর শেষ ভরসা শেখ হাসিনা।

বাহারের কথায় শেখ হাসিনা তো রাগ করেননি। বরং জানলেন, দেখলেন নেতা-কর্মীরা কী চান। তিনি কী চান তা-ও জানালেন। বাহারেরও প্রশান্তি যে, সবার সামনে তিনি তার নেত্রীকে কতটা মিনতি করেছেন দাবি নিয়ে, তা জনগণ দেখেছে। আওয়ামী লীগে একসময় চট্টগ্রামে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো নেতারা ছিলেন। এখন তৈরি হয়েছেন আ জ ম নাছির, খোরশেদ আলম সুজনরা। নারায়ণগঞ্জে ছিলেন এবং আছেন শামীম ওসমানের মতো সাহসী নেতা। এমন নেতৃত্ব অনেক অঞ্চলেই ছিলেন। দলের কেন্দ্রেও সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন, আবদুস সামাদ আজাদ, জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মোহাম্মদ নাসিমের মতো দাপুটে নেতারা ছিলেন। ওয়ার্কিং কমিটির প্রথম সদস্য কখনো ’৭১ ও ’৭৫-এর বীর যোদ্ধা বাঘা সিদ্দিকী খ্যাত বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম বা ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র ও অবিভক্ত মহানগরী আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ হানিফের মতো নেতারা। এখন তাদের অনেকেই ইন্তেকাল করেছেন। কেউ দলে অবহেলিত কেউ বা দলের বাইরে। কিন্তু তাদের শূন্যস্থান পূরণ হয়নি। এখন আর বাহাররা দলে তৈরি হন না। আওয়ামী লীগে বরং বাহারের সংখ্যা কমে গেছে। অনেকে তৈরি হলেও ছিটকে পড়েছেন নানা ঘটনাপ্রবাহে। বর্তমান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটিতে প্রেসিডিয়াম থেকে সম্পাদকমন্ডলী বা সদস্যের অনেকেই নিজেদের গণমানুষের সামনে আনবেন কি দলের ভিতরেই লাইমলাইটে আসতে পারেননি। তৃণমূল নেতাদের সমস্যা শোনার এবং সমাধান দেওয়ার সামর্থ্যও সবার নেই। দেশে ব্যাংকিং খাত থেকে নানা খাতে কত লুটপাটের ঘটনা দৃশ্যমান হয়, অর্থ পাচার আলোচিত হয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সাধারণ মানুষ সমালোচনামুখর হয় অথচ ওয়ার্কিং কমিটিতে বিশদ আলোচনা হয় না। সবাই মুখও খোলেন না। খুলনায় তালুকদার আবদুল খালেক ও রাজশাহীতে এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন মেয়র হিসেবে দলকে আগলে রাখেন ব্র্যান্ড হয়ে, প্রেসিডিয়ামে তাদের জায়গা হয় না! অনেক জেলায় স্থানীয় নেতা, কোথাও বা এমপিরা অনিয়ম-দুর্নীতি এমনকি ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে বাণিজ্যও করেন, কেউ এ নিয়ে কথা বলে না। ত্যাগী বর্তমান চেয়ারম্যান বাদ পড়ে আর হাইব্রিড মনোনয়ন নিয়ে যায় কার শক্তিতে? শেখ হাসিনা পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে আগে ত্যাগীরা মনোনয়ন ফিরে পেতেন। এবার করোনার কারণে তারা দলীয় সভানেত্রীর কাছে পৌঁছতেও পারছেন না। দলের অনেকে বিশ্বাস করেন মার্কা দিয়ে ইউপি নির্বাচনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু দলীয় ফোরামে কেউ যুক্তিতর্কে তা বলেন না।

মন্ত্রীর মধ্যে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ছাড়া কেউ রাজনৈতিক বক্তব্য দেন না। দলের নেতাদের মধ্যে আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মতিয়া চৌধুরী মাঝেমধ্যে বক্তব্য দেন। সবচেয়ে বেশি বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীর কবির নানক, মাহবুব-উল আলম হানিফ, বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজম প্রমুখ। একসময় প্রেসিডিয়ামে কতই না আলোচনা হতো। ওয়ার্কিং কমিটিতে কতজন সোচ্চার হতেন। এখন নীরব বোবার সংখ্যাই বেশি। এত বড় দলে বোবার সংস্কৃতি ব্যাপক প্রসারিত হয়েছে। তেমনি আরেকটি সংস্কৃতি চালু হয়েছে কদমবুসি। স্কুলজীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন পর্যন্ত ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি, কত বড় বড় নেতার সান্নিধ্য পেয়েছি। নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা-আনুগত্য হারাইনি। কিন্তু কখনো কদমবুসি কোথাও কাউকে করতে হয়নি। দলের স্বার্থে মানুষের স্বার্থে সত্য উচ্চারণে নেই কিন্তু সারা দেশে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতা-মন্ত্রী-এমপিদের চরণধূলি নিতে একদল নর-নারী দুয়ারে দুয়ারে ঘোরেন ব্যক্তিস্বার্থে মতলবে। আদর্শে নয়, আদর্শিক নেতা-কর্মীরা নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য রেখে সত্য প্রকাশে অসংকোচ বা দ্বিধাহীন থাকেন। নেতার চরণে ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেন না। সব কদমবুসি শ্রদ্ধা আবেগের নয়। মতলবের। বাবা-মাকে সালাম করে না, নেতাদের হামেশা! এটা মতলবি! এমন চললে রাজনীতিতে মতলববাজরা জন্ম নেবে, নেতা-সংগঠক নয়।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: