কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। গত সোমবার সন্ধ্যায় দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ কমিটির শীর্ষ এক পদে আওয়ামী লীগের এক নেতার নামও রয়েছে। এ নিয়ে কুমিল্লা উত্তর জেলার ওই নেতার নিজ উপজেলা দেবীদ্বারসহ সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বইছে।

বিএনপি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির ৪১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক পদ পেয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আক্তারুজ্জামান সরকার ও সদস্য সচিব পদ পেয়েছেন দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে পরাজিত প্রার্থী এ এফ এম তারেক মুন্সী। কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রয়েছেন পাঁচজন। তারা হলো মো. আবুল হাসেম, সৈয়দ তৌফিক আহম্মেদ মীর, মো. রমিজ উদ্দিন লন্ডনী, মো. আতিকুল আলম শাওন, মো. মহিউদ্দিন। ৩৪ জনকে এ কমিটিতে সদস্য রাখা হয়েছে।

মোটা অঙ্কের টাকার বিনিয়ময়ে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে প্রচারণা রয়েছে। বিতর্কিত ওই আওয়ামী লীগের নেতাকে দিয়ে কমিটি দেওয়ায় ত্যাগী ও মাঠের শত শত নেতাকর্মী বিএনপি ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

পদবঞ্ছিত একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যে দলে টাকার – বিনিময়ে কমিটি হয়, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতে জানে না, সেই দলে আমরা নেই। এ এফ এম তারেক মুন্সী প্রায় সময় আওয়ামী লীগের হয়েই কাজ করেছেন। তিনি নিজেকে হংকং বিএনপির সভাপতি দাবি করলেও নিজ এলাকায় বিএনপির মিছিল, মিটিংয়ে তেমন সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ না করে উল্টো যারা তৃণমূলে বিএনপির মিটিং মিছিলে অংশগ্রহণ করতেন সেই সব নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাদের দিয়ে হামলা মামলা পর্যন্ত করিয়েছেন। এরপরও তাকে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জ্ঞানা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কমিটি বিলুপ্ত করে এ আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই আহ্বায়ক কমিটিতে বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি ও কুমিল্লা-৪ দেবীদ্বার নির্বাচনী এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী এবং তার পুত্র সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রিজবিউল আহসান মুন্সীকে রাখা হয়নি। স্ত্রী সাবেক সহসভাপতি বেগম মাজেদা আহসান মুন্সীকে সদস্য পদে রাখা হলেও তার সমর্থিত ঘনিষ্ঠ জনদের কাউকে রাখা হয়নি এ কমিটিতে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করে তিন বছর আট মাস অর্থাৎ ৪৪ মাস পর ১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ আহ্বায়ক কমিটির উদ্যোগে আগামী ৩ মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে বলে জানা গেছে।

গত সোমবার দেবীদ্বারে প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪১ তম মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনা সভায় কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলে কমিটিকে বিতর্কীত কমিটি আখ্যা দিয়ে বক্তারা আলোচনায় চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা- ৪ দেবীদ্বার নির্বাচনী এলাকার বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মুঞ্জুরুল আহসান মঙ্গীকে সভাপতি এবং আক্তারুজ্জামান সরকারকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই কমিটিতে সাবেক সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীসহ তার পরিবারের ৩ সদস্যই কুমিল্লা উত্তর জেলা কমিটির প্রভাবশালী পদে ছিলেন। এদের মধ্যে কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর স্ত্রী বেগম মাজেদা আহসান মুন্সী সহআহ্বায়ক পদে এবং পুত্র ব্যারিস্টার রিজবিউল আহসান মুন্সী যুগ সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন।

বিএনপি কুমিল্লা উত্তর জেলার সাবেক সহসভাপতি মো. শাহজাহান মোল্লা বলেন, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সী আওয়ামী পরিবারের লোক। এএফএম তারেক মুন্সী কুমিল্লা-৪ দেবীদ্বার নির্বাচনী এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক উপমন্ত্রী ও বর্তমান আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সীর ছোট ভাই এবং কুমিল্লা-৪ দেবীদ্বার নির্বাচনী এলাকার বর্তমান সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের আপন চাচা। তারেক মুন্সী বিএনপির পরিচয় দিলেও আদতে বিএনপির বিপক্ষে এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে এবং ভাই (সহোদর) এএফএম ফখরুল মৃন্সীর পক্ষে কাজ করেছেন। এএফএম তারেক মুন্সীর ভাতিজা রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন, তখন নিজ ভাতিজা রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের পক্ষে কাজ করেন তিনি। ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তারেক মুন্সী নিজেই আওয়ামী লীগের একাংশের সমর্থন নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি দিয়ে পোস্টার ব্যানার ফেস্টুন বানিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। ওই নির্বাচনে এএফএম তারেক মুন্সীর বড় ভাই আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ফখরুল মুন্সী ও ভাতিজা রাজী মোহাম্মদ ফখরুল এমপির সহযোগিতায় মিথ্যা মামলা দিয়ে বিএনপির সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীকে ৩৭ দিন জেলও খাটান। একই নিয়মে ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র এবং ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ভাতিজা রাজী মোহাম্মদ ফখরুলে পক্ষে কাজ করেছেন এএফএম তারেক মুন্সী। ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনে তারেক মুন্সী আওয়ামী লীগের একংশের সমর্থনে বিজয়ী হতে বিএনপি থেকে নির্বাচন করেছিলেন। ওই সময় বনকোট ভোট কেন্দ্রে নৌকা প্রতীক পেয়েছিল মাত্র ১৬ ভোট। যে কেন্দ্রটি আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি এবং আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপদেষ্টার কেন্দ্র ছিল ওটি।

কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সী তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব ষড়যন্ত্র। ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করাকালে একটি পোস্টার বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি এডিট করে অপপ্রচার করেছে। চলমান রাজনীতিতে তরুণদের সামনে এগিয়ে আনার প্রত্যয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া আমাকে যোগ্য মনে করেই কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব করেছেন। আমি গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ভোটধিকার রক্ষা এবং দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি রোধে রাজপথে আছি। যারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছেন, তারা গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আমাকে ভোট দেননি, নৌকার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। সাবেক বিএনপি দলীয় সাংসদ আমার রাজনৈতিক গুরু, তিনি আমাকে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বানিয়েছেন। তার মনোনয়নেই আমি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করেছি। পারিবারিকভাবে এএফএম ফখ্রুল ইসলাম মুন্সী আমার বড় ভাই, রাজী মোহাম্মদ ফখরুল আমার ভাতিজা এবং সাবেক বিএনপি দলীয় এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী আমার চাচাতো ভাই।

প্রবীণ রাজনীতিক কুমিল্লা-৪ দেবীদ্বার নির্বাচনী এলাকার ৫ বারের নির্বাচিত বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীসহ তার স্ত্রী, পুত্র এবং ত্যাগী নেতাদের কমিটিতে না রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, আমার বয়স হয়েছে, আমাকে জোর করে কুমিল্লা উত্তর জেলা সভাপতি বানানো হয়েছিল। আমি শহীদ জিয়া এবং দেশ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি করি, বিএনপিতে আছি এবং থাকব। এখনকার কমিটিতে ত্যাগী নেতাদের অনুপস্থিতি থাকা স্বাভাবিক, কারণ কমিটিগুলো হয়ই বাণিজ্যিকীকরণে যারা রাতারাতি ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে লুখি লাখ টাকা খরচ করে নেতৃত্বে আসছেন তারা তার জবাব সময়ে পাবেন। ওনার স্ত্রী বেগম মাজেদা আহসান মুন্সীকে আহ্বায়ক কমিটিতে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, মাজেদা আহসান মুন্সী ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর দলীয় কোনো পদে থাকার পক্ষে নন। তিনিও আহ্বায়ক কমিটি থেকে পদত্যাগ করবেন।

সূত্রঃ আজকালের খবর

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: