করোনা ইউনিটে রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে মা-বাবার মৃত্যুর জন্য নিজেকেই দুষছেন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক জাকি উদ্দিন। এজন্য চিকিৎসা পেশা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তার এ সিদ্ধান্তের কথা জানান ডা. জাকি উদ্দিন।

বুধবার (৭ জুলাই) দিবাগত রাতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা যান তার বাবা সালাউদ্দিন (৬৬)। আর ছয় মাস আগে মারা যান মা জাহানারা নাসরিন (৫৬)।

সর্বশেষ বাবাকে হারিয়ে ফেসবুকে এক আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন ডা. জাকি উদ্দিন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমার বাবা ও মায়ের জন্য দোয়া করবেন। কোভিড রোস্টারে নাইট ডিউটিতে ছিলাম। আব্বুর অবস্থা খারাপ শুনে আমি ডিউটি থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসলাম। বাট আটকাইতে পারলাম না। জ্ঞান থাকা অবস্থায় বলতেছিল বড় বাবু ব্যবস্থা করবে। আমি আব্বু-আম্মুর খুব সুন্দর ব্যবস্থা করে দিছি। একদম এতিম হয়ে গেছি ৬ মাসের ভেতর। কোভিড দিয়ে ইনফেক্টেড করে মেরে ফেলছি। নো প্যারেন্টস ডিসার্ভ আ চাইল্ড লাইক মি হু কিলস দেয়ার প্যারেন্টস উইথইন সিক্স মান্থস (কোনো বাবা-মাই এরকম সন্তান কামনা করতে পারে না যে ছয়মাসের মধ্যে তাদের মেরে ফেলে)। আই থিঙ্ক আই শ্যাল নট কন্টিনিউ দিজ প্রফেশন অ্যানিমোর (আমি মনে করি আমার আর এ পেশাতে থাকা উচিত না)।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বুধবার রাতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ডা. জাকির তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার বাবা সালাউদ্দিন। তার ছয় মাস আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার মা জাহানারা নাসরিন। সে সময় মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী সবাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা নেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে আইসিইউতে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তার মা।

ডা. জাকির গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁওয়ে। তিনি কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্সে একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে থাকতেন।

ডা. জাকির একাধিক সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাকি উদ্দিন তার বাবা-মায়ের মৃত্যুর জন্য কোভিড ইউনিটে দায়িত্ব পালন করাকে দায়ী করছেন। কারণ করোনা চিকিৎসকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন বন্ধ করে দেয়ার পর তিনি বিভিন্ন সময় বাসাতেই কোয়ারেন্টাইন পালন করতেন। যে কারণে জাকি উদ্দিন হয়তো বলতে চেয়েছেন তার মাধ্যমেই তার বাবা-মা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

এ বিষয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. রেজাউল করিম জানান, জাকি উদ্দিন ৩৯তম বিসিএসের মাধ্যমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসক হিসেবে যোগ করেন। তবে ছয় মাসের মধ্যে বাবা-মা দুজনকে হারানোর বেদনাদায়ক।

তিনি বলেন, ‘এ (করোনা) ইউনিটে কাজ করলে ঝুঁকি থেকেই যায়। তারপরও চাকরির খাতিরে কাজ করতে হয়। তার বাবা-মায়ের মৃত্যুতে আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি।’

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. আতাউর রহমান জসিম বলেন, কুমিল্লায়ও করোনা চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য আলাদাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জন্য কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ও কুমিল্লা ক্লাবে ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা থাকলে করোনা চিকিৎসকদের পরিবার বা স্বজনরা করোনার ঝুঁকি থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকেন বলে তিনি মনে করেন।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: