ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের পাশ বেয়ে চলে গেছে গ্রামটি। পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আতাইকুলা থানার বিল গ্যারকা পাড়ের সমৃদ্ধ এই গ্রামটির নাম চরপাড়া। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত গ্রামটিতে এখন সন্ধ্যা নামলেই সবার মাঝে আতঙ্ক কাজ করে। সংঘবদ্ধ ও সশস্ত্র গরুচোরদের ভয়ে আতঙ্কে রাত কাটে গ্রামবাসীর। গরু চুরি ঠেকাতে এ গ্রামের সব গরু মালিক এখন গোয়ালঘরে রাত কাটান। অনেকে গরুর দড়ি হাতে মুঠোয় বেঁধে ঘুমান।

তারপরও থামেনি গরু চুরি। গত তিন মাসে অর্ধশতাধিক (কেউ বলেছেন একশ’র মতো) গরু চুরি হয়েছে এই গ্রাম থেকে। তবে পুলিশ এ তথ্য মানতে নারাজ।

আছিয়া খাতুন (৩৫) নামের গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, তার স্বামী রমজান আলী ভ্যানচালক। সংসারের সচ্ছলতার জন্য একটি গরু পালন করছেন। গোয়ালঘর ভাঙাচোরা হওয়ায় তার স্বামী গোয়ালঘরে রাত কাটান। গরুর দড়ি হাতে নিয়ে মেঝেতেই ঘুমান। এরমধ্যে একদিন ঘুমন্ত অবস্থায় গরুর লাথি খেয়ে আঘাত পেয়েছেন রমজান আলী।

কোরবান আলী (৬০) নামের আরেকজন জানান, তার কিছু জমিজমা আছে। সে জমি থেকে কিছু বাড়তি আয় করেন। তবে জমিতে সংসারের খরচ ওঠে না। তাই গরু পুষে বাড়তি কিছু আয় করেন। কিন্তু চোরের ভয়ে তারা দিশেহারা। তিনি ও তার স্ত্রী রেহানা খাতুন দুজন রাত জেগে জেগে গরু পাহারা দেন।

তিনি আরও জানালেন, পাকা গোয়ালঘর দেয়ার সামর্থ্য তার নেই। তাই তিনি গোয়ালঘরের চারদিকে বাবলা ও খেজুরের কাঁটা দিয়ে রেখেছেন।

‘আমার বাপ-দাদারা কেউ কোনোদিন গোয়ালঘরে থাকেনি। আজ গরু চোরদের অত্যাচারে গোয়ালঘরে থাকতে হচ্ছে। সন্তানরা নিষেধ করে গোয়ালঘরে থাকতে, তারপরও থাকছি। কারণ গোয়ালঘরে আমি না থাকলে গরু থাকবে না। আমরা চরম আতঙ্কে রয়েছি। কিন্তু আমাদের কষ্ট দেখার মতো কেউ নেই’-ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন কোরবান আলী।

গরু চুরি প্রসঙ্গে গ্রামের বাসিন্দা মোন্নাফ আলী খাঁন (৫৫) জানালেন, তার কিছু জমিজমা আছে। বাড়তি আয়ের জন্য কষ্ট করে গরু পালন করেন। একদিন তার ছয়টি গরুর মধ্যে চারটি গরু চোরেরা নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তার স্ত্রী হোসনেয়ারা খাতুন টের পাওয়াতে চোররা গরুগুলো মাঠের মধ্যে ফেলে পালিয়ে যান। পরে ভয়ে তিনি ওই চারটি গরু বিক্রি করে দিয়েছেন।’

‘চোরের ভয়ে তিনি কাঁচা গোয়ালঘর হাফ ওয়াল করে পাকা করছেন। আর পালাক্রমে জেগে থেকে বাকি গরু দুটিকে চোরের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

মোন্নাফ আলীর স্ত্রী হোসনেয়ারা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এভাবে কি জীবন চলে? সারাদিন কাজকর্ম করতে হয়। রাত জাগার কারণে সারাদিন কাজ করা যায় না।’

কৃষক আব্দুল লতিফের স্ত্রী জাহানারা খাতুন (৪৫) তিনটি গরুকে খাওয়াচ্ছিলেন। পাশাপাশি জাগো নিউজের এ প্রতিবেদককে তার কষ্টের কথা বলছিলেন।

তিনি জানান, তাদের কোনো জমিজমা নেই। গরু মোটাতাজা করে সংসারে বাড়তি কিছু আয় হয়। তাদের পাঁচটা গরু ছিল। চোরের ভয়ে দুইটা গরু বেচে দিয়েছেন। স্বামী আর তিনি গোয়ালঘরে চৌকি পেতে থাকেন। পালাক্রমে দুজনই সারারাত গোয়ালঘরে জেগে থাকেন।

চরপাড়া গ্রামের আকতার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজমিস্ত্রির কাজ করি। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম শেষে রাতে শান্তিমতো ঘুমাবো সে সৌভাগ্য হয় না। কারণ গরু পালন করি। রাত তিনটা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত গরু পাহারা দিই। ঘুম কম হওয়ায় দিনের বেলায় কাজকর্ম ঠিকমতো করতে পারছি না। এজন্য গরু বিক্রি করে ফেলার কথা ভাবছি।’

গরু চুরির শিকার আবদুল মান্নান (৫৫) বললেন, ‘একটি বাছুর গরু কিনেছিলাম তিন বছর আগে। সেটিকে তিন বছর লালন পালন করে বড় করেছিলাম। সেটি গাভিন গরু ছিল। কয়েক মাস দোয়ালে (গেলে) গাভি হতো। আমার থাকার ঘরের পাশেই গোয়ালঘর ছিল। রাত জেগে দেখার পরও একদিন অসচেতন থাকার কারণে বাজারমূল্যে দেড় লাখ টাকা দামের সেই গাভিটি গত মাসে গরু চুরি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমার গরুর গোঁড়াটি (গরুর খাবার দেয়ার জায়গা) এখন শূন্য। মনের দুঃখে গরুর গোঁড়ার ওপর লাউগাছ লাগিয়েছি।’

গরু হারানো কৃষক রেজাউল করিম জানালেন, তার তিনটি গরু চুরি হয়েছে। আর দুটি গরু আছে। তিনি গোয়ালঘরেই শুয়ে থাকেন। গরু দুটি শিকলে বেঁধে রাখেন।’

ফেরদৌসী খাতুন গ্রামের এক কৃষক বধূ জানান, প্রতিদিন গরু চোর আসে। এজন্য সারা গ্রামের মানুষ আতঙ্কে থাকেন।

চরপাড়া গ্রামের গরু মালিকদের অনেকে জানান, তাদের বলার জায়গা নেই। গরুচোর দেখে-চিনেও তারা কিছু বলতে পারেন না। ভয় পান।

তারা আরও জানান, গরু চোররা সশন্ত্র থাকে। তাদের মোকাবিলা করা নিরীহ সাধারণ জনগণের একার পক্ষে সম্ভব না। তাদেরকে প্রশাসনের লোকজন সহযোগিতা করলে এত দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।

একজন বললেন, ‘প্রতিটি চাষি বাড়ি গিয়ে দেখা যাবে, গোয়ালঘরে চাষির বিছানাপত্র। এটা সত্য ঘটনা। গ্রামে সত্যিকার অর্থে পুলিশি টহল থাকলে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।’

এ বিষয়ে পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আল মামুন হোসেন জানান, চাষিরা বাড়তি কিছু আয়ের জন্য গরু মোটাতাজা করেন। এর পেছনে আর্থিক খরচের পাশাপাশি শ্রমের বিষয়টি জড়িত আছে। সে কষ্টের গরু চুরি হয়ে যাওয়াটা দুঃখজনক। এটা চাষির একার নয়, দেশেরও ক্ষতি।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) পাবনা জেলা সাধারণ সম্পাদক ও পাবনা জেনারেল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. আকসাদ আল-মাসুর আনন জানান, যে কোনো সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন ৬- ৮ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। শ্রমজীবী মানুষগুলো যদি এভাবে দিনের পর দিন কম ঘুমান তাহলে তারা নানা শারীরিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তাদের কর্মক্ষমতা হ্রাস, হার্ট ও কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস আক্রান্ত থেকে শুরু করে স্ট্রোকও হতে পারে।

আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম ব্যাপকভাবে গরু চোরের উপদ্রবের কথা অস্বীকার করেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ওই এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে দু-চারটি গরু চুরি হয়েছে। তবে গরু চুরি বন্ধে পুলিশি টহল অব্যাহত রয়েছে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: