উগ্র মেজাজি জিতু (১৯) এলাকায় বেয়াদব ও বখাটে হিসেবেই পরিচিত। শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে মাদরাসা থেকে বিতাড়িত হয়ে হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন জিতু। ভর্তির পর থেকেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য একাধিকবার অধ্যক্ষের কক্ষে ডেকে শাসন করেন শিক্ষক উৎপল। শাসন করাই কাল হয় শিক্ষক উৎপলের। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে পিটিয়ে মারেন জিতু।

অভিযুক্ত জিতু এলাকার বখাটে কিশোরদের নেতৃত্ব দিতেন। স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় কাউকেই পাত্তা না দিয়ে বেপরোয়া চলাচল ছিল তাঁর। এলাকায় আবার ‘জিতু দাদা’ হিসেবেও পরিচিত। এই নামে রয়েছে তাঁর ফেসবুক আইডিও।

জানা যায়, আশরাফুল ইসলাম জিতু দশম শ্রেণিতে পড়লেও তার প্রকৃত বয়স ১৯ বছর। মামলায় ১৬ বছর উল্লেখ করা হলেও লেখাপড়ায় বিরতি থাকায় ১৯ বছর বয়সেও তিনি মাত্র দশম শ্রেণিতে পড়ছেন। এসএসসির রেজিস্ট্রেশনের সময় কাগজপত্রে জিতুর জন্মতারিখ দেওয়া হয়েছে ২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারি। সেই হিসাবে এখন তার বয়স ১৯ বছর ৫ মাস ১১ দিন। আর বয়সের আনুপাতিক হিসাব কষেই একাদশের শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রেমে জড়ান।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে জিতুর বাবার শাসানোর কথা জানায় এক শিক্ষার্থী। এদিন আশুলিয়ার হাজী ইউনুছ আলী কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। প্রতিষ্ঠানের দ্বাররক্ষী আব্দুস সালাম বলেন, ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই হাজির হন জিতুর বাবা উজ্জ্বল হাজী। এসেই তিনি ঘটনার বিষয় জানতে চান উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে। ঘটনা শোনার পর অনেকটা ধমকের সুরেই তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে এভাবে এত লোকের সামনে মারল, এটা কী বিশ্বাস করা যায়! তাঁর কণ্ঠে কোনো নমনীয়তা ছিল না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলে, ‘ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে শফিক স্যার জিতুকে পেছন থেকে জাপটে ধরে ফেলেন। জিতু তখন ছোটার জন্য হাত-পা ছোড়াছুড়ি করছিল। নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে ওই শিক্ষকের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করে জিতু। পরে শফিক স্যার জিতুকে ছেড়ে দিয়ে আহত উৎপল স্যারকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে আরও ৫-৭ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল জিতু। পরে কয়েকজন ছাত্রী জিতুর এ কাণ্ডের প্রতিবাদ করলে, জিতু তাদের বলে, ‘মারছি তাতে কী হইছে”! পরে পেছনের গেট দিয়ে জিতু বের হয়ে যায়। এর মধ্যে জিতুর বাবা স্কুলে এসে কোনো সমবেদনা না জানিয়ে উল্টো শাসিয়ে চলে যায়।’

ওই শিক্ষার্থী আরও বলে, ‘আমরা শুনেছি, ঘটনার দিন সন্ধ্যাবেলা জিতু এইদিক দিয়েই কিছু ছেলেপেলে সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছে, আড্ডা দিয়েছে। ওই দিন রাতেও সে এলাকায় ছিল। যদি পালিয়েই থাকে তাও হয়তো পরের দিন। এর আগেও ইভটিজিং, চুল বড় রাখা, বেয়াদবিসহ বেশ কিছু ঘটনার বিচার জিতুর বিরুদ্ধে এসেছে। সে সময় উৎপল স্যার এ সমস্ত ঘটনায় তাকে শাসন করেছেন।’

উল্লেখ্য, হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি শ্রেণিকক্ষে জিতু ও তার প্রেমিকাকে একসঙ্গে দেখে ফেলেন শিক্ষক উৎপল। শিক্ষক উৎপল শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হওয়ায় তিনি জিতুকে শাসন করেন এবং তার পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করেন। অন্যদিকে জিতুর প্রেমিকার পরিবারও বিষয়টি জানতে পেরে তাকে শাসন করে। কিন্তু বকাঝকা করার ঘটনা ফোন করে জিতুকে বলে দেয় তার প্রেমিকা।

প্রেমিকার অপমান-কষ্ট সহ্য করতে না পেরে জিতু পরিকল্পনা করেন শিক্ষককে শিক্ষা দেবেন। পরে গত ২৫ জুন দুপুরে স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন শিক্ষককে। এর দুই দিন পর ২৭ জুন শিক্ষক উৎপল আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: