‘যুক্তরাষ্ট্রেই সরকার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে ইরান’

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক সমঝোতার চাপ, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর ঝুঁকি। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে প্রধানত তিনটি পথ খোলা রয়েছে—ইরানের সঙ্গে সমঝোতা, সীমিত সামরিক হামলা অথবা নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখা।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আট মাস আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে জড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুদ্ধের কারণে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়েছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এখন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন ট্রাম্প।

উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্কিন সূত্র রয়টার্সকে বলেন, ‘ইরান যুক্তরাষ্ট্রেই সরকার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।’ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় বিজয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। পরে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমাধান আসেনি।

সমঝোতার দিকে ঝুঁকতে পারে ওয়াশিংটনমধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে রিপাবলিকানদের মধ্যে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন উপসাগরীয় সরকারগুলোর ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র।

তাদের ধারণা, ইরানে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা এখন কম। তবে পারমাণবিক স্থাপনায় সীমিত হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলে দাবি করতে পারে। একই সঙ্গে চীনও যুদ্ধের অবসানে সমঝোতার উদ্যোগ জোরদার করছে।

তবে এমন কোনো চুক্তি হলে, যাতে ইরান নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে পারে এবং ট্রাম্পকে পরাজিত দেখায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশ্লেষকেরা।

নতুন করে হামলার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে নাইরানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ শুরু করা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হতে পারে। এতে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে, অথচ সামরিকভাবে আগের চেয়ে ভালো ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

তবে ইরান যদি কোনো ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানায় কিংবা ট্রাম্পের নির্বাচনি বিপর্যয়কে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করে আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এ অবস্থায় ট্রাম্পের সামনে আরেকটি বিকল্প হচ্ছে, বর্তমান নীতি অব্যাহত রাখা। অর্থাৎ নৌ অবরোধ ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে চাপে রাখা এবং একই সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা যাচাই করা। তবে এ কৌশলের সুফল পেতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগেরের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ায় এবং তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ না থাকায় ট্রাম্পের ওপর নির্বাচনি বিবেচনার চাপ কমেছে। ফলে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন।

তিনি মনে করেন, ইরান যদি প্রতিরোধ অব্যাহত রেখে নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরে, তাহলে সেই পরিস্থিতি ঠেকাতে ট্রাম্প নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।

ইরান-ইসরায়েল পরিস্থিতিতে ভুল হিসাবের আশঙ্কামার্কিন নির্বাচনের ফলাফল ইরান যুদ্ধের আরেক গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্যও নতুন চাপ তৈরি করেছে। গত ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্বাচনে তাঁর ডানপন্থি জোট ১২০ আসনের নেসেটে ৫৩টি আসন পেয়েছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে আটটি কম।

ফলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু—দুই নেতাই এখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যুদ্ধের পরিণতির সঙ্গে আরও বেশি জড়িয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে তাঁরা সংঘাত বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারেন।

আবুধাবিভিত্তিক এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট এবতেসাম আল-কেতবি রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধের সমাধানকে আরও জরুরি করে তুলেছে, কিন্তু ইরানের জন্য সমঝোতা সহজ করেনি।

তেহরান যদি বুঝতে পারে, ট্রাম্পের সমঝোতা প্রয়োজন, তবে যেকোনো চুক্তি নয়, একটি কার্যকর চুক্তি প্রয়োজন—তাহলে যুদ্ধ শেষ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু ইরান যদি মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে দেখে, তাহলে নতুন করে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রত্যাশা কী?উপসাগরীয় দেশগুলো চায়, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল যুদ্ধ বন্ধের পথ তৈরি করুক। তবে যেকোনো মূল্যে সমঝোতা চায় না তারা।

আল-কেতবির মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত না করে, ইরানকে জাহাজ থেকে শুল্ক আদায় কিংবা রাজনৈতিক শর্ত আরোপের সুযোগ দিয়ে কোনো চুক্তি হলে তা হবে সাময়িক সমাধান। এতে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে তেহরানে ট্রাম্পের নির্বাচনি বিপর্যয়কে স্বাগত জানানো হলেও সতর্কতা কমায়নি ইরান। দেশটির প্রধান আলোচক নির্বাচনের ফলাফলকে ‘যুদ্ধের বিরুদ্ধে রায়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি পরাজয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ট্রাম্প সামরিক হামলা চালাতে পারেন—এমন আশঙ্কায় তেহরান সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আত্মসমর্পণের সামান্য ইঙ্গিতের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছেন। এতে হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছা তেহরানের নেই বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ইরানের দিক থেকেও তৈরি হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, ইরান নিজেদের সামরিক সক্ষমতা অতিরিক্ত মূল্যায়ন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করতে পারে। এমন ভুল হিসাব নতুন করে সংঘাত উসকে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় ইরান যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। তবে এতে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে, নাকি রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে ট্রাম্প নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেবেন—তা এখনো অনিশ্চিত।

আরো পড়ুন