কুমিল্লায় ১০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটির নির্মাণ শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। তবে নির্মাণ শেষে দায়িত্ব কে নেবে সেটি চূড়ান্ত না হওয়ায় এখনো চালু হয়নি এই জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানটি। বুঝে নিতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জেলা সিভিল সার্জন অফিসের ঠেলাঠেলিতে ৩৬ কোটিরও অধিক টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতাল ভবনটি পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। এতে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন জেলাবাসী।
জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে বিশেষায়িত এই হাসপাতাল। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জেলা সিভিল সার্জনকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়। তবে কোনো পক্ষই ভবনটি বুঝে নিতে রাজি হয়নি। দুই প্রতিষ্ঠানই একে অপরের দিকে ঠেলে দিয়েছে। জনবল সংকট, বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের সুরাহা না হওয়াসহ নানা সংকট তুলে ধরে এগুলো সমাধান হলে বুঝে নেওয়ার কথা বলছেন তারা।
এদিকে চলমান হাম সংক্রমণের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়া কুমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগে তীব্র শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে গাদাগাদি করে সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছে হাম আক্রান্ত শিশুরা। ৫৪ শয্যার বিপরীতে সেখানে আড়াইশরও বেশি শিশু ভর্তি রয়েছে।
নির্মাণের পরও হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় জেলার সচেতন মহল ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, সব জটিলতা নিরসন করে অবিলম্বে হাসপাতালটি যেন চালু করা হয়। এতে শুধু কুমিল্লাই নয়, আশপাশের জেলা ফেনী, নোয়াখলী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুরের মানুষও উপকৃত হবে।
কুমিল্লা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র মতে, ২০২০ সালে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বেলতলী এলাকায় ৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন একর জমির ওপর শুরু হয় ১০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটির নির্মাণকাজ। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন মাসে কাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম এন হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
এরপর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে একাধিক চিঠি চালাচালি হয় হাসপাতালটির দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য। দীর্ঘ ২১ মাস অতিবাহিত হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে এখনো কেউ হাসপাতালটি বুঝে নেয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বেলতলী এলাকায় তিনতলা বিশিষ্ট শিশু হাসপাতালটি পড়ে আছে অবহেলায়। চিকিৎসা সেবা পরিচালনার জন্য হাসপাতালটি অবকাঠামোগত পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও সেখানে নেই চিকিৎসক, নার্স, আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। হাসপাতালের পূর্বপাশে ছয় তলাবিশিষ্ট স্টাফ অ্যান্ড নার্স কোয়ার্টার। দুই তলাবিশিষ্ট গ্যারেজ কাম ড্রাইভার কোয়ার্টার। যেখানে দুটি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। ৪১৫ কেভি ভোল্ট বিদ্যুৎ সাবস্টেশন স্থাপনের জন্যও নির্মাণ করা হয়েছে একটি ভবন।
এদিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে তীব্র শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। হাম সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কুমেক শিশু ওয়ার্ড। শয্যার অভাবে বারান্দায় ঠায় নিতে হচ্ছে সংক্রমিত শিশুদের। ৫৪ শয্যার বিপরীতে শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত সেখানে ভর্তি আছে ২৫৬ জন শিশু। যেখানে দীর্ঘ ২১ মাসেরও বেশি সময় ধরে পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায় শিশুদের জন্য নির্মিত ১০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল ভবন।
এ বিষয়ে কুমিল্লার শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ইকবাল আনোয়ার বলেন, ‘বিশেষায়িত একটি শিশু হাসপাতালের শুধু ভৌত কাঠামো নির্মাণ নয়, যেদিন এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, সেদিন থেকেই জনবল প্রস্তাবনা, যন্ত্রপাতি তালিকা প্রণয়ন ও ক্রয় এবং আসবাবপত্রসহ সকল কিছু ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকবে। এর জন্য একজন প্রকল্প পরিচালক থাকবে। তিনিই এসবের দেখভাল করবেন। এই হাসপাতালের ক্ষেত্রে হয়েছে ব্যতিক্রম। শুধু ভবন নির্মাণ করে বিভিন্ন জনকে বলছেন বুঝে নেন। এভাবে কে বুঝে নিবে? প্রকল্পের মধ্যেই লেখা থাকবে, কাজ শেষে এটি কাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এখানে গলদ আছে।’
কী কারণে দীর্ঘ ২১ মাস পড়ে আছে অবহেলায় এটি তদন্ত করে বের করার দাবি জানান তিনি। সেইসঙ্গে আমলাতান্ত্রিকতার জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে হাসপাতালটি দ্রুত চালু করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানান এই বিশেষজ্ঞ।
কুমিল্লার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগের মাধ্যমে হাসপাতালটি চালুর উদ্যোগ দেওয়া যেতে পারে। এরপর তিনিই প্রয়োজনীয় জনবল, আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা দেবেন এবং সবকিছু পাওয়ার পর এটি চালু করা যেতে পারে। বিশেষায়িত এই হাসপাতালটি চালু হলে কুমিল্লার চিকিৎসা সেবায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী আহসান টিটু বলেন, ‘একমাত্র আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই হাসপাতালটি অবহেলায় পড়ে আছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এর দায় এড়াতে পারে না। তাদের উচিত অতীত বিবেচনা না করে দ্রুত সময়ে বিশেষায়িত এই হাসপাতালটি চালু করে নাগরিকদের সেবার জন্য উন্মুক্ত করা।’
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, ‘শিশু ওয়ার্ডে অফিসিয়ালি আমাদের ৫৪টি শয্যা রয়েছে। দেশব্যাপী হামের প্রকোপ বাড়ায় সংক্রমিত রোগীদের জন্য অতিরিক্ত ৪২টি শয্যা বাড়িয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে। বর্তমানে শিশু বিভাগে সর্বমোট ২৫৬ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। এর মধ্যে ১১১ জনই হাম আক্রান্ত শিশু। স্থান ও শয্যা সংকট দেখা দেওয়ায় এসব রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রেখেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে যদি কুমিল্লায় নির্মিত শিশু হাসপাতালটি চালু থাকতো, তাহলে এখানে রোগীর চাপ কমে যেত। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কুমিল্লা ও আশপাশের জেলার শিশু রোগীরা নির্বিঘ্নে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারতো।’
কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, ‘হাসপাতালটি আমরা নিতে রাজি আছি। তবে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে আগে স্বাস্থ্য প্রকৌশলকে বুঝে নিতে হবে। এরপর হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনী জনবল, আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পেলে আমরা চালুর উদ্যোগ নেব।’
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের বলেন, ‘নির্মাণকাজের সঙ্গে আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম ধরা নেই। সেগুলোর জন্য আলাদা দরপত্র হবে পরবর্তী সময়ে। সাড়ে ৫ লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। সেই বিল পরিশোধের জন্য চেষ্টা চলছে। এছাড়া যে সমস্ত সংস্কার বাকি আছে সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ভবনগুলো বুঝে নিয়ে যাদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতাল পরিচালনা হবে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
মোবাইল: +৮৮০১৭১৭৯৬০০৯৭
ইমেইল: news@dailycomillanews.com
www.dailycomillanews.com