কুমিল্লায় ৫৬৬ জুলাইযোদ্ধা অঙ্গ হারিয়ে শরীরে ক্ষত নিয়ে এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে এসব যোদ্ধা ফ্যাসিবাদ পতন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ হাত, পা, চোখ হারিয়ে বিকলাঙ্গ অবস্থায় দিন পার করছেন।
এদিকে ফ্যাসিবাদ পতনের পর নানা আন্দোলন সংগ্রাম করেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি যথাযথ চিকিৎসা এবং মূল্যায়ন। এতে এসব যোদ্ধার মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে কুমিল্লায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। পুলিশের গুলি এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় শতশত ছাত্র-জনতা আহত হন। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৫৬৬ জন আহত এবং ৪০ নিহত যোদ্ধার নাম গেজেটভুক্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, কুমিল্লা মহানগর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ী, ময়নামতি, পদুয়ার বাজার, চৌদ্দগ্রাম, নিমসার, চান্দিনা, দাউদকান্দি, গৌরীপুর হাসানপুর, কুমিল্লা সিলেট মহাসড়কের দেবিদ্বার, কোম্পানীগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় জুলাই আন্দোলনে সহস্রাধিক গুরুতর আহতের ঘটনা ঘটে। ফ্যাসিবাদ পতনের পর বহু জুলাইযোদ্ধা স্বীকৃতি পাননি। সরকারি উদ্যোগে তাদের চিকিৎসাও করানো হয়নি। তাছাড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। একদিকে চিকিৎসার অভাব অন্যদিকে যথাযথ মূল্যায়ন না পেয়ে এসব যোদ্ধাদের মাঝে ক্ষোভ এবং হতাশা বিরাজ করছে।
সদর দক্ষিণের গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধা সাগর মিয়া বলেন, ১৮ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি অংশে আমাকে বুকে পাড়া দিয়ে পুলিশ মাথায় গুলি করেছে। আমার একটি চোখ নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ১৭ দিন আইসিউতে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলাম। সুস্থ হলেও আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারিনি। আমার একটি চোখ তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়ে গেছে। চিকিৎসার অভাবে আরেকটি চোখ নষ্ট হওয়ার পথে।
আহত জুলাইযোদ্ধা আনোয়ারুল আজিম বলেন, ৪ আগস্ট ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে পুলিশ আমার দুই পায়ে গুলি করে। এ সময় আমার পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায় এবং গোড়ালির হাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। প্রায় ১৯ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার অভাবে আমার আক্রান্ত পা ধীরে ধীরে চিকন হয়ে যাচ্ছে এবং গোড়ালির নড়াচড়া প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। আমি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারি না এবং প্রচণ্ড ব্যথায় ভুগছি। বর্তমান শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য পায়ের গোড়ালি ও লিগামেন্টের পুনরায় অস্ত্রোপচারসহ উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।
সদর দক্ষিণের আহত যোদ্ধা ইসমাইল হোসেন বলেন, আমার স্ত্রী শাকিয়া কাউসার কলি কিস্তিতে টাকা তুলে কিছুদিন চিকিৎসা করাইছে। এখন টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারি না। শরীরে গুলির ক্ষতগুলো এখনো শুকায়নি। তারমধ্যে ঋণের ভারে জর্জরিত। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অসংখ্যবার হেনস্থার শিকার হয়েছি আমরা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুমিল্লা মহানগরের সাবেক আহ্বায়ক আবু রায়হান বলেন, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে জুলাইযোদ্ধারা অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে এটা কাম্য নয়। রাজপথে জুলাই যোদ্ধারা যদি বুক চিতিয়ে না দিত কখনো ফ্যাসিবাদের পতন হতো না। এসব মুষ্টিমেয় জুলাইযোদ্ধাকে চিকিৎসা এবং সম্মান দিতে কার্পণ্য করলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
জুলাই যোদ্ধা এবং কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফখরুল ইসলাম মিঠু বলেন, জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত রাজপথে অবস্থান করেছি। এখনো শরীরে ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে। আমার দুটি আঙ্গুল ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টারের দাগ রয়েছে। স্বীকৃতির জন্য নয়, আমাদের নেতা তারেক রহমানের নির্দেশে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছি।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মিজ রোজি আক্তার বলেন, জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করছে সরকার। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যে কোনো নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা প্রস্তুত আছি।
মোবাইল: +৮৮০১৭১৭৯৬০০৯৭
ইমেইল: news@dailycomillanews.com
www.dailycomillanews.com