জবানবন্দিতে যা জানালো অপ্রতিম হ*ত্যার আসামীরা

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পেছনে ছিল তার আইফোন দখল করে বিক্রি করা এবং সেই টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা। মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। জবানবন্দিতে তারা জানিয়েছে, আইফোনের প্রতি লোভ থেকেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে অপ্রতিমকে ‘বুদ্ধি দিয়ে’ সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তিনি। তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই জায়গাটি ছিল নির্জন এবং তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোর জানিয়েছে, বেলা দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে এক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। সেখানে যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। সে জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই সে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে গিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।

তিন জবানবন্দি অনুযায়ী, চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা দেয়। পরে অপ্রতিমের কাছ থেকে তার আইফোন নেওয়া হয়।

দোকানে কর্মরত কিশোরটির ভাষ্য, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর ফোনটি সে তুহিনের হাতে তুলে দেয়। তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

পরে ফোনটি ফেরত দেওয়া নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পুলিশও জানিয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। একপর্যায়ে অপ্রতিমকে মারধর করা হয়।

প্রথম আঘাত করার বিষয়েও তিন আসামির জবানবন্দিতে মিল রয়েছে। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, তুহিন প্রথমে অপ্রতিমকে একটি থাপ্পড় দেন। এরপর পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন এবং অন্য দুজনকেও মারতে বলেন।

দোকানে কর্মরত কিশোরটিও জানিয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় প্রথম আঘাত করেন। তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতেও একই তথ্য পাওয়া গেছে।

হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েও তিন জবানবন্দিতে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। তুহিন জানিয়েছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল। দ্বিতীয় কিশোরের জবানবন্দি অনুযায়ী, পরিকল্পনা ছিল আইফোনটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা ভাগ করে নেওয়া। তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, তাকে বলা হয়েছিল আইফোনটি বিক্রি করে পাওয়া অর্থের একটি অংশ তাকে দেওয়া হবে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে কে কীভাবে চলে যায়, সে বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তুহিনের ভাষ্য, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন। তবে অন্য দুই কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, তারা একসঙ্গে ঘটনাস্থল ছাড়ে, আর তুহিন অন্যদিকে চলে যান।

তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিন আসামির জবানবন্দিতেই এ তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

আরো পড়ুন