ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের এক নম্বর ওয়ার্ড থেকে পরপর দুইবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াত নেতা কাজী গোলাম কিবরিয়া। মানুষের সাথে তাঁর অমায়িক ব্যবহার দেখে বুঝার কোন উপায় নেই তিনি একজন অস্ত্র ব্যবসায়ী। হালকা পাতলা গড়নের এই কাউন্সিলর সবসময় হাসিমুখেই কথা বলেন মানুষের সাথে। তিনি জামায়াত শিবিরের একজন দুর্ধর্ষ ক্যাডার। কারো সাথে বিরোধ দেখা দিলেই শুরু হয় বিপত্তি। বেড়িয়ে আসে আসল রূপ। গত সিটি নির্বাচনেও চালিয়েছেন নৃসংশতা। আওয়ামীলীগের প্রার্থী ও তার লোকজনের উপর হমলা চালিয়ে আহত করেছিলেন অনেককে। অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়ে কারাগারেও গিয়েছেন এই কাউন্সিলর। রাজধানী গুলিস্তান থানা সহ কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে রয়েছে ১৭টি মামলা। এই মামলাগুলোর বেশিরভাগই অস্ত্র, বিশেষ ক্ষমতা আইনে, বিস্ফোরক আইনের। দেশজুরে ভয়ংকর দামি দামি অস্ত্রের কারবারের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের তথ্য মতে দেশে ছোট-বড় সব ধরনের অস্ত্রের চালানের সাথে গোলাম কিবরিয়া জড়িত। আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধ জগতের মাফিয়া গ্রুপের সাথেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। তবে এই বিষয়ে কোন প্রমাণ নেই। অস্ত্রব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি লাভ করার পর তিনি কখনোই মোবাইল সেবাদাতা কোন কোম্পানির সিম নাম্বার দিয়ে কারো সাথে যোগাযোগ বা কথা বলেন না। ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে মেসেঞ্জার অ্যাপ সহ বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে কল করে প্রয়োজনীয় কথা বলে থাকেন।

কাউন্সিলর কাজী গোলাম কিবরিয়া এলাকায় থাকেন না দীর্ঘদিন। এলাকায় থাকলেও বিদ্যুত গতিতে ছুটে চলেন। কখনো কোথাও স্থির থাকেন না। কোথাও পাঁচ মিনিট অবস্থান করলেও পাহারায় থাকেন তাঁর কর্মী বাহিনী। পুলিশের হাত থেকে বাচার জন্য পালিয়ে বেড়ান তিনি। বিভিন্ন কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। এবছরের ৩০ জুন সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার ওয়ারীর স্বামীবাগ এলাকায় রাজধানী সুপার মার্কেটের সামনে থেকে সাইদুল ইসলাম ওরফে রুবেল এবং কামাল হোসেন মজুমদার নামের দুজনকে একে-২২ রাইফেল, ৩০ রাউন্ড গুলি ও দুটি ম্যাগজিন সহ গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। গ্রেফতার দুজনই কাউন্সিলর কিবরিয়ার ঘনিষ্ট এবং তাদের বাড়ি নগরীর শুভপুর এলাকায়। তাদের রিমান্ডে নেয়ার পর বেড়িয়ে আসে কিবরিয়ার নাম। জানা যায় একজন কাউন্সিলর জামায়াত নেতা কিভাবে পর্দার আড়ালে অস্ত্র ব্যবসা করে যাচ্ছেন। ওই ঘটনার পরই দেশজুরে ছড়িয়ে পড়ে কাউন্সিলর কিবরিয়ার অপরাধ জগতের খবর। নড়েচড়ে বসেন কুমিল্লাবাসী। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত কাউন্সিলর কিবরিয়ার নাম। এর পর থেকেই পুলিশ খোঁজে বেড়াচ্ছেন কিবরিয়াকে।

এদিকে, জনগণকে সেবার প্রত্যয় ব্যক্ত করে দ্বিতীয়বারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর ওই ওয়ার্ডবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি তিনি। এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বেহাল হয়ে আছে। অন্যান্য ওয়ার্ডগুলোতে যে পরিমান উন্নয়ন হয়েছে বিশেষ করে নতুন সড়ক, ড্রেন নির্মান হয়েছে সে অনুযায়ি পিছিয়ে আছে তাঁর ওয়ার্ডটি। এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, কাউন্সিলর কিবরিয়ার গোষ্ঠীতে মানুষের সংখ্যা ও ভোটার বেশি। তাঁর গোষ্ঠীর সবাই জামায়াত-শিবির করে বিষয়টি এমন না। নির্বাচন আসলে গোষ্ঠীর ছেলে হিসেবে সব ভোট তিনিই পেয়ে থাকেন। জামায়াত নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সিমপ্যাথী ভোটের কারনে তিনি নির্বাচনে জয়লাব করে যাচ্ছেন। তাছাড়া, ওয়ার্ডের গরিব ভোটারদের বিভিন্নভাবে আর্থিক সহযোগিতা করেও মন কেরেছেন তিনি। তাছাড়া নির্বাচনের সময় দুই হাতে টাকা উড়ানোর তথ্যও ওঠে এসেছে। তবে এলাকায় তাঁর নিজস্ব বাহিনী খুবই শক্তিশালী। তাঁর অবর্তমানেও এলাকায় তারা প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন।

প্রতিবেদনটি করার সময় এলাকার বিভিন্ন মানুষের মতামত জানতে চেষ্টা করা হয়। তিন ধরনের মন্তব্য পাওয়া গেছে। সাধারণ মানুষ বলছেন এলাকার উন্নয়ন হচ্ছেনা। গুরুত্বপূর্ণ বহু সড়ক এখনো পাকা-ই হয়নি। তিনি এমন একজন কাউন্সিলর যে কিনা দেশ বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত। বিস্ফোরক ও অস্ত্র, গুলিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ইচ্ছে করলেই তাকে পাওয়া যায়না।

তবে তাঁর বাহিনী এলাকায় অত্যন্ত তৎপর। কাজী এন্টারপ্রাইজ নামে বিষ্ণপুর এলাকায় তার রড সিমেন্টে, ইটের দোকান রয়েছে। ওই দোকান থেকে বিভিন্ন বাড়ি নির্মানের সময় মালামাল সাপ্লাই নিতে হয়। জমির কেনা বেচার সময়ও নিতে হয় কাউন্সিলরের সবুজ সংকেত। সবুজ সংকেতের জন্যও দিতে হয় সম্মানি। টাকা না পেলে তার লোকজন বিভিন্ন ফন্দি এটে ভেজাল করেন। আটকে দেন কেনা বেচা। তাছাড়া কাউন্সিলর নিজেই সরকারি জায়গা দখল করে বিভিন্ন মানুষের কাছে থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি বানাতে দিচ্ছেন। সংবাদ মাধ্যমে অনেকেই কাউন্সিলর গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে নারাজ ছিলেন। যারা বলেছেন তাদের অধিকাংশ নাম প্রকাশ না করা অনুরোধ জানান।

ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও ভোটার শাহ আরশাদুল হক বিল্লাল বলেন, সিটি কর্পোরেশনের কোন ওয়ার্ডে কাঁচা রাস্তা নেই। অথচ আমাদের অনেক সড়কই কাচা। ঈদগাহ, মসজিদ, প্রাইমারী স্কুল সহ ভোট কেন্দ্রের সড়কটি বেহার হয়ে আছে।

তবে ওই ওয়ার্ডের ব্যবসায়ী আমানুল্লাহ সহ আরো কয়েকজন বলছেন, এলাকার রাস্তাঘাট ও নালার উন্নয়ন কাজ চলছে। কারো কোন সমস্যা হচ্ছেনা। কাউন্সিলর না থাকলেও দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন সব। তাঁর অবর্তমানে সচিব রবিউস সানি সব কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর পক্ষে যারা বলেছেন তারা সবাই কিবরিয়ার সমর্থক বলে জানা গেছে।

ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দা মহানগর আওয়ামীলীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক সাদেকুর রহমান রানা বলেন, এলাকায় নিরব চাঁদাবাজি চলে। এলাকার মানুষ তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার পরেও তাকে কাছে পাননা। অন্যান্য ওয়ার্ডের তুলনায় এলাকার উন্নয়ন হচ্ছেনা।

মহানগর আওয়ামীলীগের এক নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি জয়নাল আবেদীন জনি বলেন, এলাকায় চাঁদাবজি বন্ধ নেই। জমি ক্রয় বিক্রয় করতে কাউন্সিলরকে জানাতে হয়। তার অনুমতি নিতে হয়। তার চাহিদা মিটমাট হলেই জায়গা জমি কেনা বেচা হয়ে থাকে।

কাউন্সিলর গোলাম কিবরিয়া বলেন, আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা বেশি। মামলার কারনে এলাকায় না থাকতে পারলেও এলাকার সকল বিষয়ে আমি অবগত। নাগরিক সেবা ব্যহত হচ্ছেনা। আমি নিজ অর্থায়নে কয়েকটি সড়ক ও ড্রেন নির্মান করে দিয়েছি। আমার অবর্তমানে আমার সচিব ও লোকজন মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। আমি কোনভাবেই অস্ত্র ব্যবসায়ার সাথে সম্পৃক্ত না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোতয়ালী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো: সালাহ উদ্দিন জানান, কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। সে অনেক দুর্ধর্ষ । আমরা তাকে খোঁজছি। বহুবার অভিযানও চালানো হয়েছে তাকে আটক করার জন্য।