ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে দীর্ঘ ৭ বছর ধরে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। এতে করে জনবল সংকটের কারণে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। জনবলের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে উন্নয়ন, বাড়ছে ভোগান্তি সাধারণ মানুষের। এ অবস্থায় সরকারকে বার্ষিক বরাদ্দ বৃদ্ধি ও জরুরি নিয়োগের দাবি জানিয়েছে সিটি কর্তৃপক্ষ।

কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়োগ পাবার আশায় একাধিকবার চাহিদা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও অনেক শূন্য পদে নিয়োগ আসছে না। বর্তমানে করপোরেশনে কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন ৯২ জন। সর্বশেষ ১ হাজার ১২৭টি পদে লোক চেয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে জনবল নিয়োগের বিষয়টি প্রায় ৭ বছর ধরে চিঠি চালাচালিতে আটকে আছে। এ কারণে নগর ভবনে এ সময়ে কাউকে নিয়োগ দিতে পারেনি করপোরেশন। ফলে অল্প জনবল নিয়ে প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। এতে নাগরিক ভোগান্তি বাড়ছে। সিটি করপোরেশনের প্রস্তাবিত জনবলকাঠামো ও নিয়োগবিধি অনুমোদনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে ফের চিঠি দিয়েছেন মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে এ চিঠি পাঠানো হয়।

নগর ভবন সূত্রে জানা গেছে, গত সাত বছরে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদে চাকরি থেকে অনেকে অবসরে গেছেন। এখনো প্রতিনিয়ত কেউ না কেউ অবসরে যাচ্ছেন। এসব শূন্য পদও আর পূরণ হচ্ছে না। সর্বশেষ সিটি করপোরেশন ১ হাজার ১২৭টি পদে লোক চেয়ে প্রস্তাবনা পাঠায়। বর্তমানে করপোরেশনে কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন ৯২ জন।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, সিটি করপোরেশনের একটি সাংগঠনিক কাঠামো দরকার। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সেটি নেই। অবিলম্বে সেটি কার্যকর করা দরকার। সিটি করপোরেশনের আয়তন ও কর্মপরিধি বেড়েছে। কিন্তু নাগরিক সেবা বাড়েনি। দক্ষ জনবল না থাকার কারণে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা কাজ করছেন। এতে সত্যিকার অর্থে নগরবাসী কোনো সেবা পাচ্ছে না। এ কারণে সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত হচ্ছে না।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, করপোরেশনের সচিব মো: হেলাল উদ্দিন বদলি হয়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে যোগ দেন। এরপর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। করপোরেশনের সচিব প্রশাসনিক বিভাগের কাজের পাশাপাশি রাজস্ব বিভাগের বিভিন্ন কাজও তদারক করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু প্রায় দুই মাস ধরে এ পদে লোক না থাকার কারণে প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞ অচল হওয়ার পথে। এ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আবু সায়েম ভূঁইয়াকে। তিনি নগরের প্রকৌশল শাখার উন্নয়নকাজ ও নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাচ্ছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে চিঠি দেন মেয়র মনিরুল ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপম বড়ুয়া। এতে জনবলকাঠামো অনুমোদনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়।

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপম বড়ুয়া বলেন, নির্দিষ্ট পদের বিপরীতে স্থায়ী কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োজিত না থাকার কারণে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জনবলকাঠামো ও চাকরিবিধি না থাকায় নতুন লোকও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে কুমিল্লা নগরবাসীকে প্রত্যাশিত সেবা প্রদানে বিঘ্ন ঘটছে।

নগর ভবন সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন কুমিল্লা পৌরসভা ও সদর দক্ষিণ পৌরসভা একীভূত করা হয়। এর বর্তমান আয়তন ৫৩ দশমিক শূন্য ৪ বর্গকিলোমিটার। ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ করপোরেশনে ১০ লাখ বাসিন্দা রয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্নে দুটি পৌরসভার লোকবলকে সিটি করপোরেশনে সম্পৃক্ত করা হয়। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়। এতে দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: মনিরুল হক জয়ী হন। একই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি দায়িত্ব নেন। ২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি করপোরেশনের জন্য ১ হাজার ৪৪২টি পদ চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশনের প্রস্তাবিত জনবলকাঠামো অনুমোদন নিয়ে একাধিক বৈঠক করে। ২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত জনবলকাঠামো আরও কমানোর জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনকে জনবলকাঠামোর স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা খসড়া চূড়ান্ত করে প্রস্তাব দেওয়ার জন্য চিঠি দেয়। একই বছরের ২২ জুলাই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ১ হাজার ১২৭টি পদে লোক চেয়ে আবার প্রস্তাবনা পাঠায়। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ২০১৫ সালের ১৯ আগস্ট জনবলকাঠামো অনুমোদন নিয়ে সভা হয়। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বরও এ নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের জনবল ও নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়নের সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করে সভা হয়। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর জনবলকাঠামো অনুমোদনের জন্য সিটি করপোরেশন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তৎপরতা চালায়। এতেও কার্যকর ফল আসেনি।

নগর ভবনের কর্মকর্তারা বলছেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পর্যায়ক্রমে অবসরে যাচ্ছেন। এতে পদ শূন্য হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো পূরণ হচ্ছে না। বর্তমানে সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ৯২। এর মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রেষণে আছেন। বর্তমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অতিরিক্ত দায়িত্ব ও কাজের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ছেন। বিভিন্ন বিভাগ ও শাখার কার্যক্রম স্থায়ী কর্মচারী না থাকার কারণে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মী দিয়ে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে মেয়র মো: মনিরুল হক বলেন, ‘আমি টানা দুই মেয়াদে সিটি মেয়র। এ দুই মেয়াদে বেশ কয়েকবার চিঠি দিয়েছি জনবলকাঠামো অনুমোদনের জন্য। আমার কর্মকর্তারাও স্থানীয় সরকার বিভাগে তৎপরতা চালিয়ে আসছেন। কিন্তু ফল আসছে না।’

তিনি আরও বলেন, যেখানে দেড় হাজার লোকের প্রয়োজন সেখানে ৯২ জন দিয়ে করতে হচ্ছে। যার ফলে স্বল্প জনবল দিয়ে কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে শীঘ্রই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আমি মনে করি।