ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একজন মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্রসহ মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় স্বীকৃতি থাকার পরও ভাতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সাত কন্যা সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন মো.নুরুল আমিন নামের ওই মুক্তিযোদ্ধা। অভিযোগ রয়েছে, শুধুমাত্র নামের মিল থাকায় ওই মুক্তিযোদ্ধার ভাতা উত্তোলন করছেন আরেক ভুয়া মৃত মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। আর এসবের পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন চৌদ্দগ্রাম উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো.আবুল হাসেম। মুক্তিযোদ্ধা মো.নুরুল আমিনের বাড়ি উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের নালগর গ্রামে। আর যিনি ভাতা উত্তোলন করছেন তিনিও একই গ্রামের বাসিন্দা। ব্যক্তিগত বিরোধের জের থেকে কমান্ডার মো.আবুল হাসেম ওই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে ভাতা উত্তোলনের যাবতীয় কাজে সহযোগীতা করেছেন বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগী নুরুল আমিনের।

এদিকে, নিজের অধিকার ফিরে পেতে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন জনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন নুরুল আমিন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, ওই মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড থেকে শুরু করে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছেও একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। তারপরও রহস্যজনক কারনে কোন প্রকার প্রতিকার পাননি তিনি। ওই মুক্তিযোদ্ধার পরিবার ও স্থানীয়দেরও ধারণা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডারের কলকাঠি নাড়ার কারনেই প্রতিকার মিলছে না এই জালিয়াতির। বাধ্য হয়ে বর্তমানে কৃষি কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন। নুরুল আমিনের লাল মুক্তিবার্তার নম্বর-২০৪০৫০১২৮। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয় থেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নুরুল আমিনকে সনদপত্রও দেওয়া হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন বলেন, মুক্তিযদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি ভারতের কাঠালিয়া ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহন করি। মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর হায়দারের সঙ্গে ছিলাম পুরো সময়। বলা চলে আমি মেজর হায়দারের বডি গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি দেশ স্বাধীনের এতো বছর পরও আমাকে আজ নিজের অধিকার আদায়ের জন্য, আমার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও ভাতার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে।

নুরুল আমিন অভিযোগ করেন, আমার লাল মুক্তিবার্তার নম্বর ব্যবহার করে গত দশ বছর ধরে ভাতা উত্তোলন করছেন প্রায় বিশ বছর আগে মারা যাওয়া আমাদের একই গ্রামের মৃত নুরল আমিনের স্ত্রী। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম আলেয়া বেগম হলেও তিনি আনোয়ারা বেগম নামেই ভাতার টাকা তুলছেন। মৃত নুরল আমিন কখনোই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। শুধুমাত্র আমার পরিবারের সঙ্গে পূর্ব বিরোধের কারনে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবুল হাসেম জালিয়াতির মাধ্যমে ওই মহিলাকে ভাতা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এলাকাবাসী জানে ওই টাকা থেকে কমান্ডার আবুল হাসেমও ভাগ নেন। কমান্ডার আবুল হাসেম প্রায় বলে, আমি যত দিন বেঁচে আছি ততদিন তুই নুরুল আমিনের ভাতা হবে না।

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর হায়দারের সাথেই বডি গার্ড হিসেবে ছিলেন নুরুল আমিন। ভাবতে অবাক লাগে আজ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ভাতার টাকা মেরে খাচ্ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার পরিবার। তাও আবার উপজেলা কমান্ডারের সহযোগীতায়। আর বর্তমান উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবুল হাসেম নিজেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। কমান্ডার আবুল হাসেম চৌদ্দগ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বির্তকিত ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পরিচিত, তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কিনা এখন তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত চলছে, তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তার পদ পদবী ও ক্ষমতা ঠিক রেখে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবুল হাসেম বলেন, নুরুল আমিন ১৯৭৬ বা ৭৭ সালে মেট্রিক পাশ করেছে। তাহলে সে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হয়। তার বাড়ি পাশের বসুয়ারা গ্রামে ছিলো। সেখান থেকে নালগর এসেছেন তারা। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন। আর মৃত নুরুল আমিনই হচ্ছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়া তার স্ত্রী সঠিকভাবেই ভাতা উত্তোলন করছে। এখানে কোন প্রকার জালিয়াতির প্রশ্নই উঠে না।

এদিকে, বর্তমানে ভাতা উত্তোলনকারী আলেয়া বেগম ওরফে আনোয়ারা বেগম তার স্বামী মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তেমন কোন কাগজ এই প্রতিবেদককে দেখাতে পারেনি। শুধু মাত্র স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া প্রত্যয়নপত্র ও মৃত্যুর সনদপত্র দেখিয়ে এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমার স্বামী একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এটা উপজেলা কমান্ডার আবুল হাসেম সাহেবও জানেন। আমাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজালাল মজুমদার বলেন, ২০১৪ সালে মৃত নুরুল আমিনের স্ত্রী ভাতা উত্তোলনের একটা কপি নিয়ে এসে ভুল তথ্য দিয়ে আমার কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র ও মৃত্যুর সনদপত্র নিয়ে যায়। পরে জানতে পারলাম তার স্বামী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। জীবিত মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুল আমিনই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো.নাসির উদ্দিন বলেন, আমি নুরুল আমিনের করা একটি অভিযোগের তদন্ত করছি। সমস্যাটি দীর্ঘদিনের এবং জটিল বিষয়। আশা করছি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উৎঘাটন সম্ভব হবে।