ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার প্রায় ১০০ কিলোমিটার অংশে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা অন্তত ৩৫ টি। এই চিহ্নিত এলাকাগুলোতেই ঘটছে দুর্ঘটনা। এসব এলাকায় যানবাহনের অতিরিক্ত গতি, পথচারী পারাপারে অসাবধনতা এবং অদক্ষ চালকই দুর্ঘটনার প্রধান কারন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। হাইওয়ে পুলিশ বলছে, সব মহাসড়কেই যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রনে কাজ করছে পুলিশ। তবে পুলিশ ও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ সড়ক দুর্ঘটনাজনিত অপরাধে শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না বলে জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারীরা।

২০১৯ সালে কুমিল্লা জেলায় অন্তত ১২৬ টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ১৬৯ জনের । আহত হয়েছে আরো দেড় শতাধিক। ২০২০ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির দুই সপ্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে অন্তত ১১ জন। এসব দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে।

এই মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে দুর্ঘটনাপ্রবণ অন্তত ৩৫টি স্থানেই ঘটছে এসব দুর্ঘটনা। মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে দাউদকান্দি উপজেলার কুটুম্বপুর, হাসানপুর, শহীদনগর, গাজীপুর, রায়পুর, পুটিয়া, দৌলতকান্দি, বারপাড়া, জিংলাতলী, নাওতলা, আমিরাবাদ, রায়পুর। চান্দিনা- হাড়িখোলা, নুড়িতলা, ছয় কড়িয়া, দোওলা, কাঠেরপুল, গোবিন্দপুর, কোরেরপাড়। চৌদ্দগ্রাম- হাড়ি সর্দার, আমজাদের বাজার, দত্তসার, আমানগঞ্জ, নানকড়া, মোহাম্মদ আলী। বুড়িচং- নিমসার, কালাকচুয়া, কাাবিলা, কোরপাই। সদর- জাগুরঝুলি। সদর দক্ষিণ- বেলতলী, মাটিয়ারা, কমলাপুর, সুয়াগাজী, কমলপুর এলাকাগুলো বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ।

এছাড়া কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের পদুয়ার বাজার, কালা চাঁদপুর, বাগমারা, লাকসাম, খিলা, বিপুলাসার এবং কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের দেবপুর, রামপুর, দেবিাদ্বারসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘটে দুর্ঘটনা। মহাসড়ক ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা সড়কে বাস-ট্রাক চাপা, যানবাহনের নিয়ন্ত্রন হারানোর কারনে ঘটে দুর্ঘটনা। মহাসড়কে নিষিদ্ধ তিন চাকার যানবাহন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, পথচারীদের ফুটওভার ব্রীজ ব্যবহার না করা এবং যত্রতত্র মহাসড়ক পারাপার দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

সবশেষ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বুড়িচং এর কাবিলা এলাকায় দ্রুতগামী এনা বাস চাপায় মারা যায় অটোরিক্সাযাত্রী কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুজন। এর আগে জানুয়ারির ১ তারিখে মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খাদে পরে মারা যায় স্বামী-স্ত্রী, ৩ জানুয়ারি বুড়িচং কাবিলা এলাকায় গাড়ী চাপায় শহীদুল ইসলাম, ৯ জানুয়ারি বরুড়া-লালমাই সড়কে সিএনজি-ট্রাক সংঘর্ষে স্বামী-স্ত্রী, ১৩ জানুয়ারি কাবিলায় মোটর সাইকেলের ধাক্কায় সেকান্দর আলী, ২৫ জানুয়ারি চান্দিনায় বাসচাপায় পারুল আক্তার, ২৭ জানুয়ারি কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে রামপুরায় বাসচাপায় শিশু সাকিরা আক্তার মারা গেছে। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে অন্তত ২ জন।

হাইওয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোঃ নজরুল ইসলাম জানান, মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রনে আনতে সব সময়ই পুলিশ তৎপর আছে। আমরা স্পিডগান নিয়ে মহাসড়কে থাকি, যেন কোন যানবাহন অতিরিক্ত গতিতে ছুটতে না পারে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরো কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করা হবে। আমরা প্রতি মাসেই পরিবহন মালিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে মত বিনিময় করি। তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক পরামর্শ দেই। এছাড়া যাত্রীরা যেন রাস্তা পারাপারে নিরাপদ পন্থা অবলম্বন করে সে ব্যাপারেও বলে থাকি। আর মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল সম্পূর্ন ভাবে নিষিদ্ধ হলেও কখনো কখনো পুলিশের চোঁখ ফাঁকি দিয়ে তারা চলাচল করে।

“নিরাপদ সড়ক চাই” কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি এডভোকেট কামরুজ্জামান বাবুল জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কোন ভাবেই কমছে না। বিভিন্ন সময় পুলিম অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত গতির যানবাহন ধরপাকড় করলেও দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তি না হওয়ায় গতি নিয়ন্ত্রনে আসছে না। দুর্ঘটনার পরিমানও বাড়ছে। এছাড়া অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে যানবাহন চালানোর কারনেও দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দেখার জন্য যারা সরকারি ভাবে নিয়োজিত আছেন তাদেরও লোকবল কম যে কারনে ঘন ঘন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না। তবে যেভাবেই হোক সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে অপরাধী চালক ও যানবাহনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

প্রতিটি দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কিংবা পঙ্গুত্ব বরনের ঘটনায় ধ্বংস হয় একটি পরিবার। নষ্ট হয়ে যায় অনেক সাজানো স্বপ্ন। এছাড়া পরিবহন মালিকদেরও কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচার জন্য সবার আগে পরিবহন মালিক শ্রমিক ও চালকদের সচেতন হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।