কুমিল্লায় গোমতী নদীর দুই পাড়ের মাটি ৫০ জনের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে

কুমিল্লার গোমতী নদীর ৫০কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দুই পাড়ের মাটি এখন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। পুলিশ প্রশাসন, সাংবাদিকদের ম্যানেজ করে দিবা রাত্রি মাটি কেটে সাবাড় করছে ওই সিন্ডিকেট। এতে করে হুমকি মুখে পড়তে হচ্ছে গোমতীর বেরী বাঁধ।

প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাটি কাটা হচ্ছে। এসব মাটি যাচ্ছে বিভিন্ন পুকুর, জলাশয় ভরাট, ইটভাটা আর প্লট ভরাটের বা বাড়ি নির্মানের কাজে। নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রভাবশালী ৫০/৬০ জনের সিন্ডিকেট। ঠান্ডা মৌসুম এলেই মাটিকাটা বাণিজ্যের সিন্ডিকেটের লোকজন গরম হয়ে ওঠে। সিন্ডিকেটের বেতনভুক্ত কিছু লোক রয়েছে যারা মাটিকাটা দেখভাল করে।

স্থানীয়রা জানায়- কুমিল্লা মাটি সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে সদরের গোলাবাড়ির আরিফ, খায়ের মেম্বার। পাঁচথুবির রাসেল, শাহাদাত। শালধর ও সামারচরের মোরশেদ, শামীম ও শাহজাহান। ভাটপাড়া ও কাপ্তানবাজারের মাইনুল, রুমান। আমতলী এলাকার আলমগীর। দুর্গাপুরের হোসেন মেম্বার, লিটন, মিজান, জুয়েল। দিঘীরপাড়ের ইয়াকুব এবং উত্তর দূর্গাপুরের আড়াইওরার জহিরসহ আরও অনেকে। গোমতী নদীর বুড়িচং উপজেলা অংশে দুইপাড় ও চরের মাটিকাটা থেমে নেই। এই উপজেলায় রাত দশটার পর থেকেই এক্সকাভেটর নিয়ে ট্রাক্টর আর ড্রাম ট্রাকের মিছিল নামে মাটিকাটা স্পটগুলোতে। এরমধ্যে কংশনগর স্পটে জহির, সোহান, রিপন, গোবিন্দপুর স্পটে নুরুল ইসলাম, গাজিপুরে হান্নান, কামারখাড়ায় জসিম সহ আরো অনেকে বাবুবাজার, শিমাইলখাড়া, গোবিন্দপুর স্পটেও সিন্ডিকেটের বেতনভুক্ত স্থানীয় লোক দিয়ে মাটিকাটা দেখভাল করায়। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা অংশে মালাপাড়ার রামনগর, সুলতান আহমেদ, রুহুল আমিন এবং মনোহরপুর এলাকায় আমির খান, মজিব সরকারসহ স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি অংশ মাটিকাটা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

গোমতী নদীর কুমিল্লা সদর উপজেলার পূর্ব দিকের উত্তরাংশের গোলাবাড়ি এবং দক্ষিণাংশের কটকবাজার এলাকা থেকে শুরু করে বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার ও মুরাদনগর উপজেলার অন্তত ৫০ কিলোমিটার এলাকায় নদীর দু’পাড়ে মাটি কাটা হচ্ছে দুই শতাধিক স্পটে। এসব স্পট থেকে প্রতি দিন-রাতে প্রায় কোটি টাকার মাটি বাণিজ্য হয়ে থাকে। গোমতীর পাড় ও চরের মাটির প্রায় ৭০ ভাগ ব্যবহৃত হয় ইটভাটা আর বাকি অংশ আবাসিক/বাণিজ্যিকভাবে প্লটভরাট বা বাড়ি নির্মাণের কাজে। শীতের মৌসুম শুরু হলেই মাটিকাটা বাণিজ্যে জড়িত সিন্ডিকেটের লোকজন গরম হয়ে ওঠে। গত তিন মাস ধরে দিনে-রাতে গোমতী পাড়ের মাটি কাটা অবাধে চললেও প্রায়ই দিনের বেলায় প্রশাসনের অভিযানের কারণে সিন্ডিকেটের লোকজন সময় পরিবর্তন করে শ্রমিক আর এক্সকাভেটর নিয়ে সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত শতশত ট্রাক্টর, ড্রাম ট্রাকযোগে মাটি পাঠাচ্ছে উল্লেখিত গন্তব্যে। মাটিবোঝাই এসব যানবাহন উঠানামার জন্য বেড়িবাঁধ কেটে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। এতে বাঁধ ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়ক ভেঙে পড়েছে।

সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সদর উপজেলা অংশে গোমতীর উত্তর পাড়ের গোলাবাড়ি, সুবর্ণপুর, শাহাপুর, শালধর, সামারচর, ছত্রখীল, শীমপুর এবং দক্ষিণপাড়ের কটকবাজার থেকে শুরু করে বাজগড্ডা, জগন্নাথপুর, টিক্কারচর, চাঁনপুর, আমতলী, পালপাড়া বড়বাড়ি, দুর্গাপুর, বদরপুর, ভাটপাড়া, কাপ্তানবাজার, আড়াইওড়া, বানাসুয়া এবং পালপাড়া পীরবাড়ি এলাকা পর্যন্ত সুযোগ বুঝে দিনে নয়তো সন্ধ্যারাত থেকে ভোরের আলো পর্যন্ত চলে গোমতী নদীর পাড় ও চরের মাটিকাটার মহোৎসব। সদর উপজেলার দুইপাড়ে মাটিকাটার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সিন্ডিকেট রয়েছে। সিন্ডিকেটে জড়িত অনেকের নাম বেরিয়ে এসেছে স্থানীয়দের মুখ থেকে। দেবিদ্বার উপজেলা অংশে জাফরগঞ্জ, লক্ষীপুর, চরবাকর, শিবনগর, বড়আলমপুর, বিনাইপাড়, বেগমাবাদ, চাঁন্দপুর, বানিয়াপাড়া, খলিলপুর, জয়পুরসহ আরও কিছু স্পটে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে এক্সকাভেটরের মাধ্যমে মাটিকাটা। দেবিদ্বারের অন্তত ১৫টি ইটভাটায় যায় এসব মাটি।

দেবিদ্বারে মাটিকাটা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন জাফরগঞ্জের সিরাজুল ইসলাম, বানিয়াপাড়ার পলাশ, খলিলপুরের হেলাল ও জয়পুরের জহিরসহ আরো অনেকে। গোমতী নদীর মুরাদনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের আলীরচর, সোনাপুর, ঘোড়াশাল, দিলালপুর, জাহাপুর ইউনিয়নের সাতমোড়া, ছয়ফুল্লাকান্দি, গাংগাটিয়া, জাহাপুর, পুনিয়াটন, ছালিয়াকান্দি ইউনিয়নের বোরারচর, সুবিলারচর, দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল, ধামঘর ইউনিয়নের ধামঘর, নবীপুর পশ্চিম ইউনিয়নের শিবানীপুর, দক্ষিণত্রিশ, নবীপুর পূর্ব ইউনিয়নের গুঞ্জুর এলাকাসহ উপজেলার অন্তত ২০টি পয়েন্টে সন্ধ্যার পর থেকে অবাধে চলে পাড়ের ও চরের মাটিকাটা। মাটিকাটা সিন্ডিকেটের ওপর স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন মাটিখেকোরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুরাদনগর উপজেলার শুশুন্ডায় ফাহাদ আহম্মেদ, সাতমোড়ায় বিল্লাল হোসেন, বাখরাবাদে সাদ্দাম ও আমির হোসেন, আলিরচরে আবদুল্লাহ, সুবিলারচরে মজিবুর রহমানসহ আরো অনেকে মাটিকাটার পয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাদের নেতৃত্বেই প্রতিদিন শতাধিক ড্রামট্রাক ও ট্রাক্টরযোগে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, বছরের শুষ্ক মৌসুমের প্রায় পাঁচ মাস গোমতী নদীর পাড় ও চরের যে পরিমাণ মাটি কাটা হয় বর্ষা-বৃষ্টির মৌসুমে পলি জমে তা সিকিভাগও পূরণ হয় না। এভাবে ধীরে ধীরে একসময় নদীর প্রশস্ততা বেড়ে বাঁধ হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশ হারাবে ভারসাম্য।

সূত্রঃ bd24live

আরো পড়ুন