কুমিল্লার সদর উপজেলার একটি গ্রামের নাম রসূলপুর (একাত্তরে যার নাম ছিল ফকির হাট)। জেলা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত গ্রামটি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে পাক হানাদার বাহিনী গ্রামটির রেললাইনের অদূরে রাস্তার ধারের একটি উঁচু ফসলি জমিকে গণকবরে পরিণত করেছিল। ওই জমিতে কিশোর-কিশোরীসহ ৫ শতাধিক মানুষকে নিজেদের কবর নিজেদের করে নিতে হয়েছিল। আজ স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও ওই স্থানটি অরক্ষিত পড়ে আছে।

পাঁচ শতাধিক শহীদের সম্মানে নির্মিত হয়েছিল মাত্র একটি স্মৃতিস্তম্ভ; যা দিন দিন ভেঙে পড়ছে অবহেলায়-অযত্নে। নেই কোনও নামফলক, পতাকা উত্তোলনের বেদি ও সীমানা প্রাচীর। ব্যবহার হচ্ছে গোচরণ ভূমি হিসেবে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু তাহের জানান, রসূলপুর বধ্যভূমিটি স্থানীয়রা ইচ্ছামতো ব্যবহার করছেন। কেউ গুরুত্ব বুঝছেন না। পাশ্ববর্তী জনসাধারণ বধ্যভূমিটি খড়-কুটো ও গরুর মল ফেলানো এবং ধান শুকানোর কাজে ব্যবহার করছেন। আবার কেউ গরু-ছাগল বাঁধার কাজে ব্যবহার করছেন। অন্ধকার রাতে মাদকব্যবসায়ীরা এখানে বসে মাদক সেবন করেন। যার কারণে উপজেলা প্রশাসন বধ্যভূমিতে ৮টি সৌরবিদ্যুতের লাইট স্থাপন করে। বর্তমানে এর মধ্যে ৬টিই নষ্ট। বিষয়টি আমি ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে একাধিকবার জানিয়েছি।’

সরোজমিনে দেখা যায়, পাঁচ শতাধিক মানুষকে হত্যার স্থান রসূলপুর বধ্যভূমিতে স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভের টাইলস ভেঙে পড়ছে। সীমানা প্রাচীর ভেঙে পড়ে আছে। স্মৃতিস্তম্ভটি নামে মাত্র স্মৃতিস্তম্ভ। বধ্যভূমির জায়গা খুবই সংকীর্ণ। নকশা অনুযায়ী স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠেনি। স্মৃতিস্তম্ভে কোনও পতাকা উত্তোলন বেদিও স্থাপন করা হয়নি। গরু, ছাগল ও ভেড়া বাঁধা হয় সেখানে।

রসূলপুর বধ্যভূমিকৃষক মফিজুল ইসলাম (৬৫) বলেন, ‘আমার বাড়ি বধ্যভূমির পাশেই। আমি সে সময় আড়াল থেকে দেখেছি, কীভাবে দলে দলে কিশোর-কিশোরীদের গুলি করে এখানে হত্যা করা হয়েছে। গুলি করার আগে তাদের হাতেই কবর খোঁড়া হতো, পশ্চিমমুখী করে গুলি করে পা দিয়ে লাথি মেরে কবরে ফেলতো। তারপর কোনোভাবে মাটি চাপা দিতো। কয়েকদিন পর কুকুরে মরদেহগুলোর হাত-পা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করতো। সংগ্রাম শেষ হওয়ার অনেক বছর পর এখানে স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়। চারদিকে সীমানা প্রাচীর না থাকায় নেশাখোরেরা এখানে নেশা করে। এমনকি মানুষ নিজেদের বিভিন্ন কাজে স্থানটিকে ব্যবহার করছে; যা দুঃখজনক।’

কুমিল্লা সোনার বাংলা কলেজের অধ্যক্ষ আবু ছালেক মো. সেলিম রেজা সৌরভ বলেন, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রসূলপুর বধ্যভূমির পাশ দিয়ে যাওয়া-আসার সময় মানুষের হাড়, খুলি, চুল ও গুলির খোসা চোখে পড়তো। সরকার এই বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করলেও দিতে পারেনি তার পূর্ণ মর্যাদা। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবসে বধ্যভূমিতে একবার করে হলেও যদি অনুষ্ঠান করা হয়, তাহলে বধ্যভূমির মর্যাদা ও চেতনা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং যুবকদের মাঝে লালিত হতো।’

স্থানীয় বীর মুক্তিযুদ্ধা কাজী আমান উল্লাহ সর্দার বলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযুদ্ধা হিসেবে দাবি জানাই, সরকার যেন খুব শিগগিরই রসূলপুর বধ্যভূমিকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। যেন ভবিষ্যৎ প্রজম্মের কিশোর ও যুবকরা স্বাধীনতার মর্যাদা ও চেতনা সম্পর্কে জানতে পারে। বধ্যভূমির চারপাশে সীমানা নির্মাণ করে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও একজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ৯ মাস যুদ্ধ করেছি, তার অনেক গভীর ইতিহাস আছে। যা ভোলার মতো নয়।’

কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফিউল আহম্মেদ বাবুল বলেন, ‘রসূলপুর বধ্যভূমির অনেক লম্বা ইতিহাস আছে। পাঁচ শতাধিক মানুষের বধ্যভূমি হলো রসূলপুর বধ্যভূমি। আমি চাই, সেখানে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও একজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হোক। স্মৃতিস্তম্ভে নামফলক বসানো ও নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা হোক। যাতে স্থানীয়রা খেয়াল-খুশিমতো বধ্যভূমি ব্যবহার করতে না পারেন।’

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: