কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকারের দুজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও একজন সাবেক মন্ত্রী রয়েছেন। এরপরও কমিটিতে পারিবারিকীকরণ ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির।

এদিকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ার কথা। এরই মধ্যে দলের মেয়র পদের প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিভেদ প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে। ২০১৩ ও ২০১৭ সালে পরপর দুবার কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হেরেছেন মনে করেন দলটির নেতারা।

কুমিল্লায় উত্তর জেলা, দক্ষিণ জেলা, মহানগরসহ তিনটি কমিটি। তিনটিই সাংগঠনিক জেলা মর্যাদার। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের উপস্থিতি এবং দ্বন্দ্বের কারণে দক্ষিণ জেলা ও মহানগরের রাজনীতি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়।

দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং সাধারণ সম্পাদক সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তিনজনই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।

মহানগর কমিটির ৭১ সদস্যের মধ্যে ৬২ জনই সভাপতি এবং সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিনের (বাহার) সমর্থক। বাহাউদ্দিনের আগে দীর্ঘদিন কুমিল্লা শহর ও জেলার শীর্ষ নেতা ছিলেন আফজল খান। এই দুই নেতার মধ্যে দ্বন্দ্বও পুরোনো। গত মাসে আফজল খান মারা গেছেন। তাঁর মেয়ে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ আঞ্জুম সুলতানা মহানগরের সহসভাপতি। তিনি একটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। চার বছর আগে মহানগর কমিটি হলেও সভাপতি ও সহসভাপতি একসঙ্গে কোনো বৈঠকে যোগ দেননি। শহরের রাণীর বাজার নিজ কার্যালয় ও মডার্ন কমিউনিটি সেন্টারে দলীয় কর্মসূচি পালন করেন আঞ্জুম সুলতানা। বাহাউদ্দিন রামঘাটে দলীয় কার্যালয় ও কুমিল্লা টাউন হলে দলের কর্মসূচি পালন করেন।

বাহাউদ্দিন বলেন, ‘আমার সঙ্গে আফজল খানের দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু তাঁর মেয়ের সঙ্গে তো ছিল না। কেন তারা দ্বন্দ্বে জড়াল? আমিই তো তাকে সহসভাপতি করেছি।’

অন্যদিকে আঞ্জুম সুলতানা বলেন, মহানগরে বাহাউদ্দিন কাউকে কোনো ভূমিকা রাখতে দেন না। তাঁর কর্মসূচিতে আসা লোকজনকে হয়রানি করেন। তিনি নিজের মতো দলের কাজ করছেন।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেশি, তার মধ্যে কুমিল্লা অন্যতম।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, কুমিল্লাতে অনেক আগে থেকেই দলে বিভক্তি রয়েছে—এটা ঠিক। এবার সিটি নির্বাচন ঘিরে যাতে এই বিভক্তি না বাড়ে, সেই চেষ্টা দলের আছে। তিনি জানান, সিটি নির্বাচনের পরই জেলা ও মহানগরের সম্মেলন হবে।
সিটি নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্ব

২০০৮ সালের নির্বাচনে সদর আসন থেকে বাহাউদ্দিন সাংসদ হওয়ার পর আফজল খান পরিবার কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ২০১২ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে আফজল খান হেরে যান। এ জন্য অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী মনে করে আফজল খান পরিবার।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বাহাউদ্দিন আবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। স্বতন্ত্র প্রার্থী হন আফজল খানের ছেলে মাসুদ পারভেজ খান। ২০১৭ সালে সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা। তিনিও হেরে যান। পরে আঞ্জুম সুলতানাকে সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ করা হয়।

আঞ্জুম সুলতানা বলেন, গত সিটি নির্বাচনে তাঁর পরাজয়ের পেছনে সাংসদ বাহাউদ্দিন জড়িত ছিলেন—এটা সবাই জানেন। এবার তাঁর ভাই মাসুদ পারভেজ প্রার্থী হতে পারেন।

তবে বাহাউদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচনে পাস করলে আমাকে কেউ কৃতিত্ব দেয় না। পরাজিত হলে দায় সব আমার হয়।’ তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনে অতীতে প্রার্থী বাছাই ঠিক ছিল না। এ জন্য পরাজয় হয়েছে।

দলীয় সূত্র বলছে, এবার সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় আছেন মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক। তিনি বাহাউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ। এর বাইরে আছেন মহানগরের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক নূর উর রহমান মাহমুদ এবং যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আনিসুর রহমান। এই দুজন বাহাউদ্দিনবিরোধী হিসেবে পরিচিত। মাসুদ পারভেজ খানও সম্ভাব্য প্রার্থী।
দক্ষিণে ত্রিমুখী লড়াই

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা কমিটি ২০০৬ সাল থেকে প্রায় এক দশক বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলেছে। ২০১৬ সালে বর্ধিত সভার মাধ্যমে মুস্তফা কামালকে সভাপতি ও মুজিবুল হককে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহসভাপতির পদ পান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম।

কমিটিতে মুস্তফা কামালের দুই ভাই স্থান পেয়েছেন, মুজিবুল হকের ভাতিজা ও তাজুল ইসলামের শ্যালকও আছেন। কমিটির বাকিদের বড় অংশই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী। ফলে ভেতরে-ভেতরে তাদের প্রতিযোগিতা রয়েছে। তাজুল ইসলাম যুক্ত হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রতিযোগিতা ত্রিমুখী রূপ নিয়েছে।

অবশ্য তাজুল ইসলাম বলেন, তিনি সভাপতি হতে চান—এটা কাউকে বলেননি। মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই তিনি ব্যস্ত আছেন।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন, প্রার্থীর জয়-পরাজয় এবং কমিটিতে কে কোন পদ পাবেন—এসব নিয়ে অসন্তোষ থাকবে। ফলে কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্বের শিগগিরই অবসান দেখছেন না নেতা-কর্মীরা।

সূত্রঃ প্রথম আলো

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: