সামগ্রিক চাহিদার দ্বিগুণ মাছ উৎপাদন হচ্ছে কুমিল্লায়। এক সময় ‘মাছের অভয়ারণ্য’ খ্যাত কুমিল্লায় এ বছরও চাহিদা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। মাছ উৎপাদনে এবারও দেশের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এ জেলা। জেলার এ বছর চাহিদা ও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন হয়েছে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৫৫১ মেট্রিকটন। জেলার মোট চাহিদা এক লাখ ৪৬ হাজার ৩৫৭ মেট্রিকটন। চাহিদার তুলনায় এক লাখ ৪৭ হাজার ১৯৪ টন মাছ বেশি উৎপাদন হয় ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাকৃতিক উৎস ছাড়াও কুমিল্লায় মাছের চাহিদা পূরণ ও অধিক উৎপাদনের মূল কারণ হচ্ছে প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ। উৎপাদিত মাছের অর্ধেকের বেশি জোগান দিচ্ছে জেলার দাউদকান্দি, মেঘনা, হোমনা, মুরাদনগর ও তিতাস উপজেলার প্লাবন ভূমির মাছ। ভরা মৌসুমে দাউদকান্দির প্লাবন ভূমি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ইলিয়টগঞ্জ, বাশরা, আউটিয়াখোলা, রায়পুরসহ বিভিন্ন গ্রামে চারদিকে মাছ চাষের উৎসব। জেলে ও কৃষকের পাশাপাশি ওই এলাকার শিক্ষিত তরুণরাও মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। কুমিল্লার বিভিন্ন প্লাবন ভূমি ছাড়াও নদী, পুকুর ও জলাশয়ে উৎপাদিত মাছ জেলার চাহিদা মিটিয়ে জোগান দিচ্ছে দেশের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায়ও। ফলে বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চাষকৃত মাছ উৎপাদনে চীন ও ভারতের পরই পঞ্চম স্থানে বাংলাদেশ। আর প্রাকৃতিক ও চাষের মাছ মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন বলেন, জেলার ৫৬ লাখ লোকের মাছের চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছের চাহিদা যোগান দিচ্ছে এ জেলা থেকে। সাতটি সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার ও ৫৭টি বেসরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার হতে ২১-২২ অর্থ বছরে পাঁচ লাখ দু’হাজার ১৯৭ কেজি রেণু উৎপাদন হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন নার্সারী থেকে দু’হাজার ৬২০ লাখ পোনা উৎপাদন হয়েছে। ২৫ হাজার ৫৬০জন মৎস্য চাষিকে বেড় জালসহ বিভিন্ন উপকরণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া জেলায় ৮৪ হাজার ৪২৮টি পুকুরে উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৪৪ হাজার ৯২ মেট্রিকটন।

কুমিল্লায় প্রথম প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ শুরু হয় দাউদকান্দি উপজেলায় যা সারা দেশের মধ্যে মডেল। ১৯৮৬ সালে এ উপজেলায় প্রথম প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ শুরু করেন ধনুয়াখোলা গ্রামের সুনীল কুমার রায়। তার দেখাদেখি অন্যরাও এগিয়ে আসেন। আর এখন প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দাউদকান্দি ছাড়াও কুমিল্লার মেঘনা, হোমনা, মুরাদনগর, তিতাস উপজেলায়ও প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ হচ্ছে। এসব উপজেলার লক্ষাধিক পরিবার চলছে মাছ চাষের আয় দিযে। স্থানীয়রা জানায়, এসব এলাকায় একসময় খাল-বিলে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যেতো। কিন্তু মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে চাহিদা, শুরু হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে মাছ নিধন। ফলে জলাশয়ে দেখা দেয় মাছের সংকট। এরপরই মূলত শুরু হয় মাছ চাষ। তাছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকায় এক ফসলের বেশি হয় না। এ জলাবদ্ধতা কাজে লাগিয়ে শিক্ষিত তরুণ, কৃষক ও জেলেরা শুরু করে মাছ চাষ। পরবর্তীতে তাদের মুখে ছড়িয়ে পড়েছে রুপালি মাছের হাসি।

স্থানীয় মৎস্য চাষি মনির হোসেন বলেন, প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষের ফলে দাউদকান্দি ও আশপাশের জলাঞ্চলের মানুষের অভাব ঘুচেছে। হাসি ফুটেছে তাদের মুখে, সুখ ফিরেছে সংসারে। তাঁর মতে, শিক্ষিত তরুণরাই এখন এ পেশায় বেশি ঝুঁকছে। ফলে কমেছে বেকারত্বও। তাদের দেখাদেখি আশপাশের এলাকার মানুষও এখন প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে বলে জানান মনির হোসেন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন বাসসকে আরও বলেন, জেলার মধ্যে শুধু দাউদকান্দিতে তিন হাজার হেক্টর প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ হয়। এ উপজেলার শিক্ষিত তরুণরা মাছ চাষে সম্পৃক্ত হওয়ায় বেকারত্ব দূর হয়েছে। সেই সঙ্গে মাছের উৎপাদনও বাড়ছে। তাছাড়া মাছের চাষ ও রোগ প্রতিরোধে মৎস্য বিভাগ চাষিদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গণভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য চাষকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার শুভ সূচনা করেছিলেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- ‘মাছ হবে এ দেশের দ্বিতীয় প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ।’

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: