কুমিল্লা নগরীতে গত চার বছরে আলোচিত তিন রাজনৈতিক খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে নাম আসে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) সাবেক চার কাউন্সিলরের। তাঁদের তিনজনই সদ্য সাবেক কাউন্সিলর এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা। তিনজনের মধ্যে একজন আবার জোড়া খুনে অভিযুক্ত। চতুর্থ জন ২০১২ সালে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি যুবদলের নেতা।

আলোচিত ওই চার সাবেক কাউন্সিলর আগামী ১৫ জুন অনুষ্ঠেয় কুসিক নির্বাচনেও কাউন্সিলর পদে লড়তে মাঠে নেমেছেন। এরই মধ্যে তাঁদের মনোনয়নও বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আলোচিত তিন খুনে অভিযুক্তরা হলেন কুসিকের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসান, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি মো. আবদুস সাত্তার, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও সদর দক্ষিণ উপজেলা যুবদলের সভাপতি মো. খলিলুর রহমান মজুমদার এবং ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন।

তাঁদের মধ্যে আলমগীর মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের পদে ছিলেন। খুনের অভিযোগ ওঠায় তাঁকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় যুবলীগ। আবুল হাসান ও খলিলুর রহমান আপন খালাতো ভাই। আর সাত্তার এ দুজনের ঘনিষ্ঠ। এই চারজনই হত্যা মামলায় কারাগারে ছিলেন। জামিনে এসে এখন তাঁরা নির্বাচন করছেন।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর নগরীর চৌয়ারা এলাকায় যুবলীগকর্মী জিল্লুর রহমান চৌধুরীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে একদল সন্ত্রাসী। ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত কুসিকের দ্বিতীয় নির্বাচনে ২৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে জিল্লুর কাউন্সিলর পদে লড়ে পরাজিত হয়েছিলেন। হত্যার পরদিন তাঁর ভাই ইমরান হোসেন চৌধুরী সদর দক্ষিণ থানায় ২৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরো ১০/১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। আলোচিত এই মামলার প্রধান আসামি কুসিকের সদ্য সাবেক কাউন্সিলর আবুল হাসান, ২ নম্বর আসামি আবদুস সাত্তার এবং ৪ নম্বর আসামি সাবেক কাউন্সিলর খলিলুর রহমান মজুমদার। গত বছরের ২৫ জানুয়ারি এ মামলায় সাত্তার গ্রেপ্তার হন। এর কিছুদিন পর এ মামলায় কারাগারে যান আবুল হাসান ও খলিলুর রহমান। তাঁরা প্রত্যেকেই প্রায় ছয় মাস জেল খাটেন।

২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর রাতে নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের শামবক্সি (বল্লভপুর) এলাকায় সন্ত্রাসীরা ছাত্রলীগ নেতা দেলোয়ারকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে। দেলোয়ারও ২০১৭ সালের নির্বাচনে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করে খুনে অভিযুক্ত সাত্তারের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। দেলোয়ার দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদে ছিলেন। হত্যার ঘটনার পরদিন নিহতের বড় ভাই মো. শাহাদাত হোসেন নয়ন বাদী হয়ে সদর দক্ষিণ থানায় মামলা করেন। ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আনোয়ার হোসেন গ্রেপ্তার হন। আনোয়ার মামলার প্রধান আসামি রেজাউলের বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন। পরে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আনোয়ার জানান যে ছাত্রলীগ নেতা দেলোয়ার খুনের মূল পরিকল্পনাকারী কাউন্সিলর সাত্তার।

গত বছর জিল্লুর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাত্তারকে পিবিআইয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

২০২০ সালের ১০ জুলাই নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি সড়কের চাঙ্গিনি মোড় এলাকায় সদ্য সাবেক কাউন্সিলর আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ কর্মী আক্তার হোসেনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় কাউন্সিলর আলমগীরসহ ১০ জনকে আসামি করে মামলা করেন আক্তারের স্ত্রী রেখা বেগম। এ মামলায় জামিন নিতে গিয়ে কারাগারে যেতে হয় আলমগীরকে।

ছাত্রলীগ নেতা দেলোয়ার হত্যা মামলার বাদী শাহাদাত হোসেন নয়ন বলেন, ‘আশা করছি, এবারের নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে মানুষ খুনিদের উপযুক্ত জবাব দেবে। ’

জিল্লুর হত্যা মামলার বাদী ইমরান হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘মানুষ খুনিদের জনপ্রতিনিধির আসনে দেখতে চায় না। ’

দেলোয়ার ও জিল্লুর হত্যা মামলার তদন্ত করছে পিবিআই, কুমিল্লা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পিবিআই, কুমিল্লার পরিদর্শক বিপুল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘আমাদের তদন্ত একেবারেই শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করতে পারব। ’

জোড়া খুনের অভিযোগ প্রসঙ্গে সদ্য সাবেক কাউন্সিলর আবদুস সাত্তার বলেন, ‘দেলোয়ার ভাই ছিলেন আমার রাজনৈতিক গুরু। আর জিল্লুর ভাইয়ের সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই। এর পরও আওয়ামী লীগের একটি অংশের লোকজন আমাকে পরিকল্পিতভাবে এ দুটি হত্যাকাণ্ডে জড়িয়েছে। আমি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার। ’

আরেক অভিযুক্ত আবুল হাসান বলেন, ‘আমাকেও জিল্লুর হত্যা মামলায় পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়। আমি এ ঘটনায় জড়িত ছিলাম না। ’

জিল্লুর হত্যায় অভিযুক্ত খলিলুর রহমান বলেন, ‘ভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় এ মামলায় কারাবরণ করতে হয়েছে আমাকে। আশা করছি তদন্তে সব প্রমাণিত হবে। ’

আওয়ামী লীগ কর্মী আক্তার হোসেনের ভাই যুবলীগ নেতা শাহজালাল আলাল বলেন, ‘এলাকার মানুষ আলমগীরকে বয়কট করেছে। এবার আমিও কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে আছি। সুষ্ঠু ভোট হলে তিনি জামানত হারাবেন। মানুষ তাঁর বিচার চায়। ’

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সদ্য সাবেক কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমি পর পর দুইবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর। মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে। ’

মানবাধিকার সংগঠক ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা হলফনামায় তাঁদের সব তথ্য দিয়ে থাকেন। সেগুলো যাচাই করে নির্বাচন কমিশনের উচিত এসব তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা। তাহলে মানুষ তাদের ভোট কাকে দেবে, সেই বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে সহজে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), কুমিল্লার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, এখন ভোটারদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাঁরা কাকে নির্বাচনে ভোট দেবেন। ভোটাররা সচেতন হলেই বিতর্কিত ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধির আসনে বসতে পারবেন না।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: