আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে দুই লক্ষ আটচল্লিশ হাজার পশু প্রস্তুত করছেন কুমিল্লার খামারিরা। করোনা পরিস্থিতির কারণে বাজারের চেয়ে খামারে ক্রয় বিক্রয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে। কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে কোরবানীর পশুর হাট ব্যবস্থাপনা এবং পবিত্র ঈদ-উল-আযহার জামায়াত বিষয়ক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়।

সভায় জানানো হয়, কুমিল্লায় কোরবানীর পশুর চাহিদা ২ লাখ ৪৮ হাজার। মজুদ আছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৩২টি। এবারের ঈদের জন্য স্থায়ী পশুর হাট আছে ৭৫টি এবং এ পর্যন্ত অস্থায়ী হাটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৩৭৯টি। তবে অস্থায়ী পশুর হাটের আরও সংখ্যা বাড়তে পারে। কোরবানীর হাটে সরকার নির্ধারিত হাসিল প্রতি ১ টাকায় ১১ পয়সা বলে জানানো হয়। এছাড়াও সভায় জানানো হয়, কুমিল্লা কেন্দ্রিয় ঈদগাহে পবিত্র ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ৮ টায়। সে জন্য সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দেয়া হয়।

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে সভায় জানানো হয়, চামড়া সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ মজুদ রয়েছে। বিসিকের তথ্যানুসারে স্বাধীনতার পরে এ বছরের মতো এতো লবণ আগে কখনও উৎপাদিত হয়নি। সুতরাং লবণ নিয়ে যেকোন গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোরবানীর পশুর কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে ছাপানো পোস্টার বিলি করা হয়। সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার কুমিল্লার উপ পরিচালক মোহাম্মদ শওকত ওসমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, কুমিল্লা সিটি সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী ড. শফিকুল ইসলামসহ অন্যান্যরা।
জানা গেছে, প্রতি বছর কোরবানী ঈদকে সামনে রেখে কুমিল্লা খামারি ও কৃষকরা গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত থাকেন। কোরবানি ঈদে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে গবাদিপশু ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় রফতানি করে থাকে কুমিল্লার খামরিরা। দেশে গেল বছর ভারত থেকে কোরবানির হাটে পশু বেশি থাকায় গরুর দাম ছিল কম ছিল। তারপরও আশা ছাড়েনি খামারীরা।

তাই এ বছরও কোরবানিকে সামনে রেখে দেশি গরু ও ছাগল মোটাতাজা করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কুমিল্লার খামারীরা। তেমনি ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী জেলা কুমিল্লার ১০হাজার খামারি প্রায় দুই লক্ষ ৫৮ হাজার পশু কোরবানির গবাদিপশু প্রস্তুত করেছে। কোরবানির পশু প্রস্তুত করা কুমিল্লার খামারিদের অনেকে জানান, সীমান্তবর্তী এই জেলায় ভারতীয় গরুর আধিক্য ঠেকানো না গেলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা। জানা যায়, কুমিল্লার ৪২ কি.মি সীমান্তবর্তী বিভিন্ন উপজেলা দিয়ে আসে প্রায় শতভাগ গরু ভারতীয়। এসব গরু সীমান্তের বিভিন্ন পকেট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গরুর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় নাগরিকেরাও এ দেশে গরু নিয়ে প্রবেশ করছেন। ফলে করোনার ভারতীয় ধরন আরও বড় আকারে ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশু পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কুমিল্লার খামারিরা। খামারিরা বলছেন এবার জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ পশু রয়েছে, তাই পাশর্^বর্তী দেশ ভারত হতে গরু প্রবেশ করলে ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগও বলছেন এবার কুমিল্লাতেই পশু রয়েছে চাহিদার তুলনায় বেশি।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় এবার দুই লক্ষ আটচল্লিশ হাজার পশু কোরবানির চাহিদা আছে। তার বিপরীতে এবার পশু রয়েছে দুই লক্ষ আটান্ন হাজার চারশ বত্রিশটি।

প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় কোরবানির জন্য যে পরিমাণ পশু রয়েছে তাতে চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ১০ হাজারের অধিক পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। জেলার সদর উপজেলার খামারি জাহিদ বলেন, আমরা গরুকে কোনো প্রকারের রাসায়নিক খাদ্য দিচ্ছি না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক দানাদার খাবার, ঘাস এসবই খাওয়ানো হচ্ছে। জেলার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতির আরেকজন খামারি সোহাগ বলেন, আমার খামারে এই মুহূর্তে দেশি, শাহীওয়াল, ফিজিয়ান, ফিজিয়ান ক্রস জাতের গরু রয়েছে। আমার এখানে ৪০০ থেকে ১১০০ কেজি ওজনের পর্যন্ত গরু রয়েছে।

কুমিল্লা দক্ষিণ চর্থা বড় পুকুর পাড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিছনে জাহানারা এগ্রো ফার্মের মালিক মো: রিপন জানান- আমার অনেক বড় বড় গরু রয়েছে। এখানে প্রায় ডজন খানিক গরু নিজস্ব দেশীয় পদ্ধতিতে লালন পালন করে কোরবানীর জন্য প্রস্তুতি করেছি। ইতিমধ্যে ক্রেতারা আসতে শুরু করেছে। ভালো দাম পেলে অবশ্যই গরু বিক্রি করবো। তিনি আরও বলেন- শেষ মুহূর্তে বাজারে ভারতীয় গরু চলে আসলে আমাদের পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না, লোকসানে পড়তে হবে আমাদের। তাই সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন থাকবে ভারতীয় গরু যাতে প্রবেশ করতে না পারে সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার।

খামারিরা আরো অভিযোগ করেন,এবার পশুর সঠিক দাম পেলে তাই আগামীতে গো-খামার আরো বাড়বে। কিন্তু পশুর দাম না পেলে অনেক খামারি নিঃস্ব হয়ে পড়বে। খামারীরা আরো জানান, এবার জেলার অনেক গ্রাম অঞ্চলে বড় ষাড় পালন করছেন ছোট-বড় খামারিরা। চড়া দামের খড়, খৈল, গমের ভাত, কাচা ঘাস, ভুষি ও নালী খাবার দিয়ে এসব গরু মোটা-তাজা করা হচ্ছে। তাদের এসব গরু ঈদ হাটে বিক্রি করে তারা লাভবান হবেন।

এদিকে ঈদকে সামনে রেখে পশু কোরবানি নির্বিঘ্ন করতে জেলা প্রাণী সম্পদ বিভাগও নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর কুমিল্লার কর্মকর্তারা জানান, এবার সঠিক পদ্ধতিতে পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো সংরক্ষণ বিষয়ে ৪৪৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বাজার গুলোতে রাখা হচ্ছে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম। এছাড়াও মনিটরিং করা হচ্ছে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণের সাথে জড়িত খামারিদেরও।

সার্বিক বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কোরবানির ঈদকে ঘিরে এবছর আমাদের পর্যাপ্ত পশু মজুদ রয়েছে। উদ্বৃত্তও থাকবে। আমাদের এবার প্রায় ৮১ টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম বিভিন্ন উপজেলার হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাকে চাহিদমত সেবা দিবে। ইন্ডিয়া হতে এবার যাতে গরু না আসতে পারে সে ব্যাপারে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। আমরা কড়াকড়িভাবে বিষয়টি মনিটরিং করছি। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সাথেও এবিষয়ে আমাদের কথা হয়েছে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: