ডেস্ক রিপোর্টঃ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রকৃতিকে ধ্বংস করে আধুনিকীকরণ করা কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী ধর্মসাগর দিঘির পশ্চিম পাড় দখল হয়ে গেছে। বাণিজ্যিক দোকান পাঠ করে রাজনৈতিক দোকান মালিকরা দখল করে নিয়েছে ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ের অর্ধেকের বেশি জায়গা। ফলে নৈশ্বর্গিক সৌন্দর্য্য যেমন লুপ্ত হয়েছে তেমনি প্রকৃতিপ্রেমি মানুষ পড়ছে নানা বিড়ম্বনায়। অপর দিকে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন বলছে, দুই দফা নোটিশ দিয়েও দখলদারদের উচ্ছেদ করা যায় নি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে। সাত দিন করে সময় নেয়া হয়েছে। আর প্রকৃতিপ্রেমিরা বলছেন, গণমানুষের সম্পদ দখলদারে হাত থেকে অতিদ্রুত মুক্ত করে সেখানে আবার প্রকৃতিক সৌন্দর্য্য পুনপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

ত্রিপুরার মহারাজা ধর্মমাণিক্য ১৪৫৮ সালে ধর্মসাগর দিঘি খনন করেন। এ এলাকার মানুষের খাবার পানির কষ্ট দূর করার জন্য এই ২৩ দশমিক ১৮ একর জায়গায় এই দিঘিটি খনন করেন। ১৫ শ শ্রমিক সাড়ে ৭ শ দিন সময় নিয়ে দিঘিটি খনন করেন। ধর্ম মাণিক্য দিঘিটি খনন করায় তার নাম অনুসারে দিঘিটিকে ধর্মসাগর দিঘি নাম করণ করা হয়। এটিকে বলা হয় শহরে সিঁদুরের টিপ। প্রকৃতিপ্রেমি মানুষ প্রতিদিন ছুঁটে যান ধর্মসাগর দিঘির পাড়ে প্রকৃতির স্বাদ নিতে। এই ধর্মসাগর পাড় ঘিরেই আছে কয়েকটি ঐতিহ্যবাহি প্রতিষ্ঠান। রাণীর কুঠীর, কুমিল্লা নজরুল ইন্সটিটিউট, নগর উদ্যান, গুলবাগিচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রতিবন্ধি স্কুল, পূর্বপাড়ে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, স্টেডিয়াম, কুমিল্লা জিলা স্কুল, দক্ষিণপাড়ে কুমিল্লা মহিলা মহাবিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

ধর্মসাগর পাড়ে প্রাত:ভ্রমণকারীদের একজন রাফি সামস জানান, ঐতিহ্যবাহী ধর্মসাগর পাড়ের যে নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য ছিল তা শেষ করে ফেলা হয়েছে। ধর্মসাগর পাড়ের চারপাশ ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিকিকরণ করা হয়েছে। পশ্চিম পাড়ের সম্পূর্ণ পায়ে হাটার পথটি দিকে তাকালে প্রকৃতিপ্রেমী যে কারোরই হৃদয়ে মুচড়ে উঠবে। এই পথটির মাঝখানে এবং দীঘির পাড় ঘেঁষে ছিল পুরু ঘাসের আস্তরন, সেগুলো ধ্বংস করে পুরো রাস্তাটিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কংক্রিটের ঢালাই করা হয়েছে। এই পথের বেশ কিছু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। দৃষ্টিকটুভাবে সেখানে বসানো হয়েছে দোকানপাট। আরো দুঃখের বিষয় সেই সব দোকান-পাটও মানহীন খাদ্য পন্যের। তাছাড়া হকারের আধিক্য এতই যে এখানে হাটাচলা করাও মুশকিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে স্থানগুলোতে ঘাস ছিল তা কংক্রিটের করা হয়েছে এসব হকার বসানোর জন্যই। প্রকৃতি ধ্বংস করে এমন আধুনিকীকরণ কারোই কাম্য নয়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ের অর্ধেক জায়গা দখল করে ফেলা হয়েছে। স্থায়ীভাবে ঢালাই ও লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে দোকান পাঠ। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়ে কাউন্সিলর ও রাজনৈতিক ক্যাডার এবং স্থানীয়দের ছত্রছায়ায় স্থাপন করা হয়েছে এসব দোকানপাঠ।  বড় আকারে পাকাপোক্তভাবে নির্মাণ করা দোকানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কাউসারের শাহি চটপটি’, ‘কুমিল্লা জিলা স্কুলের চাচার চটপটি’, ‘কুমিল্লার বিখ্যাত মা মনি তৃপ্তি ও চটপটি’, ‘পার্ক বই মেলা’, ‘পার্ক ক্যাফে’, ‘পার্ক ফুচকা’ ‘রেইনবো’ প্রভৃতি। এছাড়া অস্থায়ীভাবে রয়েছে আরো ১০/১৫টি ছোট আকারের দোকান।

ধর্মসাগর পাড়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চটপটির দোকানগুলো তাদের সামনের রাস্তা ও ধর্মসাগর দিঘির পশ্চিমপাড়ের দিঘির দেয়াল তাদের সম্পত্তি হিসেবে দখলে নিয়ে সেখানে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। দোকানের সামনে কোন প্রকৃতি প্রেমি আনমনে বসলে তাদের তুলে দেন। খাবার না কিনলে বসতে দেন নে। প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে সেখানে চালানো হচ্ছে দোকানদারি। অবৈধ দখল জায়েজ করতে একজন দিয়ে বসেছেন বইয়ের দোকান। যাতে মানুষের সহানুভুতি মেলে। বইয়ের দোকান বললে কেউ তুলতে আসবে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ের আলোক বাতি অনেকগুলো নষ্ট হয়ে আছে। স্ট্রিট ল্যাম্প পোষ্টও নেই। প্রকৃতির দ্বীপ্তি ছড়ানো গাছগুলোকে কৌশলে গরম পানি ঢেলে হত্যা করা হচ্ছে। অথচ ধর্মসাগরের পশ্চিমপাড়ে ছিল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য। সেখানে ছিল বাহারি রঙের গাছগাছালি। ছিল ফুটপাতের মাঝখানে ফুলের গাছ। দিঘির পাড়ে ছিল সবুজ ঘাসের সমারোহ। যে কোন প্রকৃতিপ্রেমি মানুষ এই পাড় দিয়ে হেঁটে গেলে প্রাণ জুড়িয়ে যেতো। মুগ্ধভাবে মানুষ উপভোগ করতো প্রকৃতির অপরূপলীলা।

ভ্রমণকারী রাফি শামস জানান, ধমর্সাগর উত্তর ও পূর্ব পাড়ের নগর উদ্যানেও প্রকৃতি ধ্বংস করে কংক্রিটের জঞ্জাল বানানোর পায়তারা হচ্ছে। রহস্যময়ভাবে গোড়ায় পচন ধরে কিছু গাছ মারা গেছে, কিছু গাছ একা একাই ভেঙ্গে পড়ছে।

এখানে একটি স্থাপনা যা পূর্বে পার্কের কর্মচারীদের থাকার জন্য ব্যবহার হতো সেটি বেমানানভাবে একটি এনজিওকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ছিন্নমুল শিশুদের পাঠদানের নামে। অথচ এখানে একটি বিশ্রামাগার করা যেতো, যা খুবই প্রয়োজন ছিল। নগর শিশু উদ্যানের অবস্থা আরো ভয়াবহ। এখানে শিশুদের খেলার জন্য আর কোন উম্মুক্ত স্থান বাকী রাখা হয়নি। অপরিকল্পিত ভাবে গাদাগাদি করে বসানো হয়েছে নানারকম যান্ত্রিক ‘রাইড’। সেসব রাইডও ত্রুটিপূর্ন। পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ন এসব রাইড চড়ে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। সম্ভবত বাংলাদেশের কোথাও সরকারী শিশু পার্কে এমন মানহীন রাইড এবং এতো চড়া মূল্য নেয়ার নজির নেই। পার্কের শেষ প্রান্তে ব্যায়ামগারের পাশে একটি পাঠাগার রয়েছে যা কবে খোলা হয়েছে কেউ বলতে পারবেন না।

সংস্কৃতিকর্মী মোতাহার হোসেন মাহাবুব জানান, পার্কের এসব দোকান ঘিরে বখাটেদের আড্ডা। শিশু পার্কের নামে ধর্মসাগরের উত্তর পাড়ের নগর উদ্যানের স্থান পুরেটা অযাচিত দখল করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী জামতলার বেদী মূলটি যে কখন শিশু পার্কের নামে দখল হয়ে যায়- এ নিয়ে আশংকা প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতিকর্মীদের অনেকে। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে নগর উদ্যানে যারা মুক্ত বাতাস গ্রহণ করতে যাবেন তারা ধুলোবালি আর শব্দদূষণে অনেকটা অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন। এক সময় নগর উদ্যানে ব্যাঙ সাগর নামে ছোট একটি পুকুর ছিল, তাও ভরাট করা হয়েছে। ওখানে প্লাস্টিক ফুল ও টব দিয়ে সাজানোর মাঝে প্রাকৃতিক স্বাভাবিক সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়েছে- একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ওখানে এখন নিয়মিত নেশাখোরদের আড্ডা বসে।

নগর উদ্যানের স্বাভাবিক সৌন্দর্যের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরাও।

জাগ্রত জনতার মঞ্চ সংগঠনের নিজাম উদ্দিন রাব্বী জানান, গণসাক্ষরসহ স্মারকলিপি দিয়েছি। জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা কোন ব্যবস্থা নেয় নি।

মীর্জা সিরাজুল ইসলাম নামে কুমিল্লার এক বাসিন্দা ফেসবুকে জানান, দখলদারদের কাছ থেকে ধর্মসাগর দিঘির পাড় ও পার্ক মুক্ত করে কুমিল্লার জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।  ফেসবুকে কিশোর মজুমদার নামে একজন লিখেছেন, দখলদারদের ডেকে সবাই মিলে ‘ধর্মসাগরডা তাগো মাথায় তুলে দেন’।

সৈয়দ জুবায়ের রাসেল লিখেছেন, ‘মনে হয় ধর্মসাগর পাড় এখন চটপটি ওয়ালাদের আর আমরা সবাই তাদের কাস্টমার, বসার জায়গা সব তাদের দখলে। আগে সবাই পা ভিজিয়ে বসতাম আর এখন…?’

পলাশ কবীর নামে একজন জানান, ধর্মসাগরের পাড় তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য হারিয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ব্যবসায়িক পার্কে পরিণত হয়েছে। চারদিকে দোকানপাঠ, ফুসকার দোকান আর রঙচঙা ডেকোরেশন এর ঐতিহ্য বিলীন হতে চলেছে। এই ধর্মসাগর পাড় আর সেই ধর্মসাগর পাড় নেই।

ধর্মসাগর দিঘির পশ্চিমপাড় দখলদারদের দখলে যাওয়া প্রসঙ্গে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো: জাহাংগির আলম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জানান, দখল মুক্ত হবে কিনা ? এই প্রশ্ন রাজনীতিকদের কাছে করেন। দখলদারদের উচ্ছেদ করার জন্য দুই দফা নোটিশ দিয়েছি। দুই দফা রাজনীতিকরা সাত দিন সময় চেয়েছে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: