কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভোগান্তিতে সেবা প্রত্যাশীরা!

একটি আবেদনপত্র হাতে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন সাধারণ নাগরিক। চোখে প্রত্যাশা, নিজের সমস্যার একটি সমাধান মিলবে, প্রশাসনের কাছে পৌঁছাবে তার কথা। কিন্তু সেই আশার জায়গায় যদি প্রথম ধাপেই তৈরি হয় অনিশ্চয়তা, তাহলে একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য প্রশাসনের দরজা কতটা সহজলভ্য থাকে?

কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ই-সেবা কেন্দ্র বা ফ্রন্ট ডেস্কে বিরুদ্ধে এমনই অভিযোগ উঠেছে। যেখানে নাগরিকদের অভিযোগ, আবেদন ও বিভিন্ন সরকারি সেবার কাগজপত্র গ্রহণ করার কথা, সেখানেই আবেদন জমা দিতে গিয়ে অর্থ দাবির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের।

তাদের অভিযোগ, আবেদন জমা দিতে নির্ধারিত কোনো সরকারি ফি না থাকলেও নানা অজুহাতে টাকা দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে আবেদন গ্রহণ বা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া নিয়ে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।

জানা যায়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ফ্রন্ট ডেস্ক বা ই-সেবা কেন্দ্র মূলত নাগরিকদের প্রশাসনিক সেবা সহজ করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন সরকারি আবেদন গ্রহণ, প্রাথমিক যাচাই, অনলাইন আবেদন সংক্রান্ত সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান, কাগজপত্র গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানোর কাজ করা হয়। পাশাপাশি নাগরিকদের আবেদন ও অভিযোগের অগ্রগতির বিষয়েও তথ্য দেওয়ার দায়িত্বও এই কেন্দ্রের।

অভিযোগ উঠেছে, কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ই-সেবা কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা নাগরিকদের অনেককে আবেদন জমা দেওয়ার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত অর্থ দিতে হচ্ছে ।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, জেলা প্রশাসক বরাবর কোনো আবেদন ই-সেবা কেন্দ্রে জমা দিতে গেলে সেখানে দায়িত্বরত ফটোকপি মেশিন অপারেটর আবুল কালাম অর্থ দাবি করেন।

এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি আবেদন গ্রহণের সময় ফটোকপি মেশিন অপারেটর আবুল কালাম এক সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলছেন এবং তার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। ওই সময় তার পাশে অফিস সহকারী মো. কামরুজ্জামানকে বসে থাকতে দেখা যায়।

ভুক্তভোগী ওই সেবাগ্রহীতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমি একটি আবেদন জমা দিতে এসেছিলাম। আবেদনপত্রটি হাতে নিয়ে আবুল কালাম সাহেব সেটিতে চোখ বুলান। দেখে নেন। পরে চা-নাস্তার খরচের কথা বলে টাকা দাবি করেন। আবেদন জমা হবে না, এই ভয়ে আমি ৫০০ টাকা দিই। টাকা নিয়ে তিনি পাশে বসে থাকা আরেক ব্যক্তির (কামরুজ্জামান) কাছে দেন।’

ওই সেবাগ্রহী আরও বলেন, প্রশাসনের কাছে সমস্যা সমাধানের আশায় এসে যদি শুরুতেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে অনেকে হয়রানির ভয়ে এখানে আসতে আগ্রহী হবেন না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ফটোকপি মেশিন অপারেটর আবুল কালাম তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কারো কাছ থেকে টাকা নিইনি। আমাদের টাকা নেওয়ার কোনো সিস্টেম নেই। আমরা শুধু আবেদন গ্রহণ করি।’

ভিডিওতে টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে আবুল কালাম বলেন, ‘কেন আমাকে টাকা দিয়েছে, সেটা আমার জানা নেই। আমি এ ধরনের কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত নই।’

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আপনার কাছেই প্রথম অভিযোগের বিষয়টি জানতে পেরেছি। জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, ই-সেবা কেন্দ্রে সরাসরি কোনো নগদ অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই। সরকারি কোনো নির্ধারিত ফি থাকলে তা চালান, অনলাইন পেমেন্ট কিংবা অনুমোদিত পদ্ধতিতে জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ফলে ফ্রন্ট ডেস্কে অননুমোদিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ও নাগরিক আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে ই-সেবা কেন্দ্রগুলোতে আরও কঠোর নজরদারি, অভিযোগ গ্রহণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা, সেবার নিয়ম ও সম্ভাব্য ফি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রদর্শন এবং অননুমোদিত অর্থ লেনদেন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান সেবাপ্রার্থীরা।

আরো পড়ুন