আধা কিলোমিটারের কাজ চলছে মাসের পর মাস: কুমিল্লার ‘আমতলীতে’ নিত্য দুর্ভোগ

মাত্র আধা কিলোমিটার মহাসড়কের সংস্কার কাজ মাসের পর মাস ধরে চলায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার আমতলী অংশে প্রতিদিনই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

সেইসঙ্গে টানা বৃষ্টিতে সড়কে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ তৈরি হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। শুক্রবারও ওই অংশকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট দেখা দিয়েছে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে হাইওয়ে পুলিশের টহল ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চললেও সড়কের গতি ফিরছে না। সংস্কারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কির্তিমান চাকমা বলছিলেন, “বৃষ্টি হলেই আমতলী এলাকার ভোগান্তি নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়ায়। গত তিন থেকে চার সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে মহাসড়কের এই অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

তিনি বলেন “মূল সড়কের পাশাপাশি সংস্কারকাজ চলাকালে ব্যবহৃত বিকল্প অংশেও পানি জমে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ফলে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গত দুই দিনে আমতলীতে অন্তত চারটি মালবাহী ট্রাক গর্তে আটকে যায়। পরে রেকার দিয়ে সেগুলো সরিয়ে নিতে হয়েছে। এতে দীর্ঘ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, “বৃষ্টির কারণে সড়কের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতি হয়েছে। নিয়মিত ইটের খোয়া ফেলে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার কাজ চলছে।”

তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহাসড়কের এই আধা কিলোমিটার অংশের সংস্কারকাজ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি তিনি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাত্র আধা কিলোমিটার মহাসড়কে মাসের পর মাস চলছে সংস্কার কাজ। তার ওপর টানা বৃষ্টিতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের আমতলী এখন যানজটের নিত্যভোগান্তির কেন্দ্র।

হাইওয়ে পুলিশ জানায়, কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাস সংলগ্ন আমতলী এলাকায় প্রায় আধা কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজ গত তিন মাস ধরে চলছে। কংক্রিটের ঢালাইয়ের কাজ চলমান থাকায় এক পাশের সড়ক বন্ধ রেখে অন্য পাশ দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।

তবে টানা বৃষ্টিতে বিকল্প লেনে তৈরি করা সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তের কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে। পাশাপাশি গর্ত থেকে কাদা-পানি ছড়িয়ে আশপাশের ভালো সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

হাইওয়ে পুলিশ বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে ধীরগতির যান চলাচলের কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় আটকে থাকার ভোগান্তি এড়াতে অনেক যানবাহন উল্টো পথে চলার চেষ্টা করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

শুক্রবার সকালে ঢাকামুখী লেনে সৃষ্ট এ যানজট কুমিল্লা সদর উপজেলার আলেখারচর থেকে সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন শত শত যানবাহনের চালক ও হাজারো যাত্রী।

যানজট নিরসনে ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানার একাধিক মোবাইল টিমের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাজ করলেও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের দ্রুত সংস্কার না হওয়ায় পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।

ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানার বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই আনিসুর রহমান বলেন. “গত তিন মাস ধরে এই অংশে সংস্কার কাজ চলমান। এরই মধ্যে সংস্কার কাজের আশপাশের অংশও ভেঙে যাচ্ছে। যানবাহনের তীব্র চাপ এবং দীর্ঘ যানজট নিয়ন্ত্রণে গত তিন দিন ধরে আমাদের পুলিশ সদস্যরা দিন-রাত মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করছেন।”

তিনি বলেন, “দ্রুত সড়ক সংস্কার করা না হলে ভোগান্তি দিন দিন বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের জন্য সওজ বিভাগকে বারবার জানানো হলেও এখন পর্যন্ত অস্থায়ী বা স্থায়ী কোনো কার্যকর সংস্কারকাজ শুরু হয়নি।”

হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কির্তিমান চাকমার ভাষ্য, “বিষয়টি একাধিকবার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিনই যানজট বাড়ছে এবং জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করছে।”

শুক্রবার মহাসড়কে আটকে পড়া কয়েকজন চালক জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা বেশি সময় লাগছে। এতে জ্বালানি অপচয়ের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ‘এশিয়া লাইন’ বাস চালক হানিফ সরকার বলেন, “বাস যেমন তেমন সব জায়গা দিয়ে চলে যায়। কিন্তু ভারি ট্রাক বা নিচু প্রাইভেট কার গর্তে নামতে চায় না। তাদের ধীর গতির কারণে পুরো জ্যামটা লাগে।”

ট্রাক চালক আমজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত তিনটা মাস আমার চট্টগ্রাম একটানা আসা যাওয়া করতে হয়- আর ঢাকায় ফিরতেই আমি এখানেই আটকাতে হয়। মালামালে বোঝাই থাকে ট্রাক। চাইলেও গর্ত ওপর দিয়া চালাতে পারি না। পিঁপড়ার মত চলতে হয়।”

যানজটে আটকে থাকা আরেক যাত্রী সোহান আহমেদ বলেন, “ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে দেশের অর্থনতির লাইফলাইন। এটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংস্কার করতে হবে। সংস্কার যেমন টেকসই হতে হবে তেমনি সংস্কারের আগে টেকসই বিকল্প পথও তৈরি করতে হবে।”

“এখন দেখা যাচ্ছে, সংস্কার আর দুর্ভোগ সমানে চলছে। এভাবে তো চলা যায় না।” যোগ করেন তিনি।

পেশার ব্যবসায়ী এ যাত্রী বলেন, “দীর্ঘ সময় যানবাহনে আটকে থাকায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।”

এ বিষয়ে জানতে কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আমতলী অংশের সংস্কারকাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।

আরো পড়ুন