পাঁচ বছরে বন্ধ ১৮ জোড়া ট্রেন, ভোগান্তিতে কুমিল্লা-লাকসামের যাত্রীরা

কুমিল্লা অঞ্চলে একের পর এক ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়ছে যাত্রীদের ভোগান্তি। গত পাঁচ বছরে লোকাল ও আন্তনগর মিলিয়ে বন্ধ হয়েছে ১৮ জোড়া ট্রেন। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প আয়ের মানুষের দ্রুত ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের জন্য চালু করা চার জোড়া ডেমু ট্রেনও। ফলে চাহিদার তুলনায় ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কুমিল্লা-লাকসামসহ আশপাশের রেলপথে বাড়ছে যাত্রীচাপ। বাধ্য হয়ে অনেকে বাড়তি খরচে সড়কপথে যাতায়াত করছেন।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় অর্থে কেনা কোটি টাকার ডেমু ট্রেন পড়ে আছে লাকসাম জংশনের লোকোশেডে। দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় ট্রেনটির শরীরজুড়ে মরিচা ধরেছে। নষ্ট হচ্ছে সিট, পাখা, ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কারিগরি সক্ষমতা ও দক্ষ জনবলের অভাবে অচল ডেমুগুলো মেরামত করে পুনরায় চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, একসময় কুমিল্লা-নোয়াখালী ও কুমিল্লা-চাঁদপুর রুটে ২০ জোড়া এবং কুমিল্লা-ঢাকা ও কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রুটে ৩৪ জোড়াসহ মোট ৫৪ জোড়া লোকাল ও আন্তনগর ট্রেন চলাচল করত। গত পাঁচ বছরে এর মধ্যে ১৮ জোড়া ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়া ট্রেনের মধ্যে রয়েছে চার জোড়া ডেমু।
বর্তমানে পূর্বাঞ্চলে লোকাল ও আন্তনগর মিলিয়ে ৩৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এসব ট্রেনে যাত্রী চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পূরণ হচ্ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে বিকল্প হিসেবে সড়কপথ বেছে নিতে হচ্ছে।
লাকসাম লোকোশেডে পড়ে আছে কোটি টাকার ডেমু:
২০১২ সালে চীন থেকে ২০ সেট ডেমু ট্রেন আমদানি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এসব ট্রেন আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আনা হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই অধিকাংশ ডেমু বিকল হয়ে পড়ে।
কুমিল্লা অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ ছিল চার সেট ডেমু। বর্তমানে চারটিই অচল। এর মধ্যে একটি পড়ে আছে লাকসাম জংশনের লোকোশেডে। তিন কোচ ও দুই ইঞ্জিনের এই ট্রেনটির বিভিন্ন অংশে মরিচা ধরেছে। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় ভাঙাচোরা সিট, পাখা ও ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
লাকসাম জংশনের লোকোশেড ইনচার্জের তথ্য অনুযায়ী, ডেমুটি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণহীন অবস্থায় থাকায় এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ট্রেন কমেছে, বেড়েছে যাত্রীচাপ:
কুমিল্লা অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন লাকসাম। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন রুটের যাত্রীরা এই স্টেশন ব্যবহার করেন। ফলে ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে লাকসামসহ আশপাশের স্টেশনগুলোর যাত্রীদের ওপর।
বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা আগে ডেমু ও লোকাল ট্রেনে তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াত করতেন। এসব ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন অনেকেই আন্তনগর ট্রেনের ওপর নির্ভর করছেন। এতে আসনভিত্তিক টিকিটের ওপর চাপ বেড়েছে। অনেক সময় টিকিট না পেয়ে যাত্রীদের ফিরে যেতে হচ্ছে।
কুমিল্লা স্টেশনে টিকিট না পেয়ে ফিরে যাওয়া যাত্রী সুজন বলেন, ‘কুমিল্লা অঞ্চলে চলাচল করা লোকাল ও ডেমু ট্রেন বন্ধ হওয়ায় মানুষ বিপাকে পড়ছেন। আগে এসব ট্রেনে চড়ে স্বল্প সময়ে গন্তব্যে যাওয়া যেত। এখন ট্রেন সংকটের কারণে চাহিদামতো টিকিটও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে সড়কপথে যেতে হচ্ছে।’
স্থানীয় সংবাদকর্মী আফরাতুল করিম রিমু বলেন, ‘একটি ট্রেন একসঙ্গে অনেক যাত্রী পরিবহন করতে পারে। কিন্তু এখন ট্রেন না থাকায় আমাদের বাসমুখী হতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে কোথাও যেতে হলে ডেমু ট্রেন থাকলে আমরা অনেক সুবিধা পেতাম।’
চাঁদপুরে মেঘনা, নোয়াখালীতে উপকূল:
চাঁদপুর ও নোয়াখালী রুট পুরোপুরি ট্রেনশূন্য নয়। চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে বর্তমানে মেঘনা এক্সপ্রেস এবং নোয়াখালী রুটে উপকূল এক্সপ্রেস আন্তনগর ট্রেন হিসেবে চলাচল করছে। কুমিল্লা-নোয়াখালী রুটে উপকূল এক্সপ্রেসের পাশাপাশি নোয়াখালী মেইলও চলাচল করছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব রুটে চলমান ট্রেনের সংখ্যা ও সেবার পরিমাণ যাত্রীদের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের জন্য ডেমু ও লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে। ফলে লাকসাম, কুমিল্লা ও আশপাশের স্টেশনগুলোতে চলমান ট্রেনগুলোতে বাড়ছে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ।
৩০ কোটি টাকার সম্পদ পড়ে নষ্ট:
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, লাকসাম জংশনের লোকোশেডে পড়ে থাকা ডেমুটির মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকায় রাষ্ট্রীয় অর্থে কেনা মূল্যবান এই সম্পদ এখন নষ্টের পথে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ কারিগরি সক্ষমতা ও দক্ষ জনবলের অভাবে এসব ডেমু মেরামত করে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে একদিকে যাত্রীরা সাশ্রয়ী ও দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা হারাচ্ছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থে কেনা মূল্যবান সম্পদও নষ্ট হচ্ছে।
টিকিট বিক্রিতে বড় অঙ্কের আয়:
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলের সংশ্লিষ্ট চারটি রুটে গত অর্থবছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই টিকিট বিক্রি হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকার।
যাত্রীদের প্রশ্ন, এত বিপুলসংখ্যক মানুষ রেলপথে যাতায়াত করলেও চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন বাড়ানো হচ্ছে না কেন? বিশেষ করে লাকসাম জংশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে ট্রেনের সংখ্যা না বাড়ালে ভবিষ্যতে যাত্রীচাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
আসনভিত্তিক টিকিটের চাহিদা বেড়েছে তিনগুণ:
কুমিল্লা স্টেশন মাস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেক যাত্রী আন্তনগর ট্রেনে যাতায়াত করতে পারেন না। স্বল্প খরচে তারা ভ্রমণ করতে চান। ডেমুসহ লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ থাকায় স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। একই সঙ্গে আসনভিত্তিক টিকিটের চাহিদা তিনগুণ বেড়েছে।’
লাকসাম জংশনের স্টেশন মাস্টার মো. ওমর ফারুক ভূঁইয়া বলেন, ‘ডেমুগুলোতে আগে যথেষ্ট আর্নিং ছিল। ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি নতুন গাড়ির ব্যবস্থা করে, তাহলে যাত্রীদের চাহিদা অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব হবে।’
ডেমু চালু হলে কমবে ভোগান্তি:
কুমিল্লা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী আনিছুর রহমান বলেন, ‘ডেমুগুলো পুনরায় মেরামত করা হলে যাত্রীদের চাহিদা অনেকটাই পূরণ হবে বলে মনে করি। এতে স্বল্প ব্যয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ আবারও তৈরি হবে।’
লাকসাম জংশনের লোকোশেড ইনচার্জ সাইফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডেমুটি নষ্ট। ডেমুগুলো বন্ধ থাকায় বিভিন্ন স্টেশনে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও আমাদের সড়কপথ ব্যবহার করতে হয়। কুমিল্লা অঞ্চলের যাত্রীরা এতে কয়েকগুণ বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।’
যাত্রীদের দাবি, অচল ডেমুগুলো দ্রুত মেরামত করে চালু করার পাশাপাশি কুমিল্লা-লাকসাম অঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন লোকাল ও আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হোক। এতে একদিকে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে রেলওয়ের আয়ও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
