১ ডলারে ২০ লাখ রিয়াল, প্রায় ২ কোটিতে মিলছে ১ কেজি মাংস

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দরপতন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মুক্তবাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম ছাড়িয়েছে ২০ লাখ ইরানি রিয়াল।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দশকের মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি চলমান যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। এতে রিয়ালের মান কমার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও দ্রুত বেড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে ২০ লাখ রিয়ালে প্রায় ৪ কেজি টমেটো, আধা কেজি মুরগির মাংস এবং এক লিটারের কিছু কম রান্নার তেল কেনা যেত। এখন একই অর্থে এসব পণ্যের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ কেনা সম্ভব।

টমেটোর দাম বেড়েছে ৭১ শতাংশ, মুরগির মাংস ৭৪ শতাংশ এবং রান্নার তেলের দাম ১৭৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে ওষুধের ক্ষেত্রে। ইনসুলিনের দাম বেড়েছে ৬৪২ শতাংশ। প্যারাসিটামলের দাম বেড়েছে ৯৩ শতাংশ এবং শিশুখাদ্য ফর্মুলার দাম ৯৫ শতাংশ।

তেহরানের এক নারী আলজাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের আগে তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিন থেকে ছয় মাসের পরিকল্পনা করার সুযোগ ছিল। এখন তাদের প্রধান চিন্তা মাসের শেষ পর্যন্ত আয় দিয়ে সংসার চালানো।

দেশটির অনুমোদিত ন্যূনতম মজুরি চলতি ইরানি বর্ষে ১৬ কোটি ৬০ লাখ রিয়াল, যা প্রতিবেদনের হিসাবে প্রায় ৮২ ডলারের সমান। সরকারি সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা যোগ করলেও তা ১০৮ ডলারের নিচে।

ব্যবসায়ীরাও সংকটে পড়েছেন। তেহরানের এক পোশাক ব্যবসায়ী জানান, গত বছরের তুলনায় তার বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি, কাঁচামাল ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশের এক নারী জানান, আগে সপ্তাহের বাজার করতে যেখানে প্রায় ৫ লাখ তোমান লাগত, এখন একই বাজারে অন্তত ৫০ লাখ তোমান খরচ হচ্ছে। ফলে মাংস ও মুরগির মতো খাবার অনেক পরিবারকে বাদ দিতে হচ্ছে।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়নি; তবে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাণিজ্যে বাধা, নিষেধাজ্ঞা এবং স্থবির আয় পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ফলে দেশটির কোটি কোটি মানুষের জন্য এখন মূল প্রশ্ন—মাসিক আয় দিয়ে মাসের প্রয়োজনীয় খাবার ও অন্যান্য খরচ কতটা মেটানো সম্ভব।

২০ লাখ রিয়ালে আগে যা মিলত, এখন কতটুকু পাওয়া যায়যুদ্ধের আগে ২০ লাখ রিয়াল দিয়ে প্রায় ৪ কেজি টমেটো, আধা কেজি মুরগির মাংস এবং প্রায় ১ লিটার রান্নার তেল কেনা যেত। এখন একই অর্থে তার অর্ধেকেরও কম পণ্য পাওয়া যায়।

সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ওষুধের দাম। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জীবন রক্ষাকারী ইনসুলিনের দাম ৬৪২ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া রান্নার তেলের দাম ১৭৭ শতাংশ, মুরগির মাংস ৭৪ শতাংশ এবং টমেটো ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

যুদ্ধের আগে এক কেজি টমেটোর দাম ছিল ৯ লাখ ৪০ হাজার, এখন তা ১৬ লাখ ১০ হাজার রিয়াল। কমলার কেজি যুদ্ধের আগে ছিল ১১ লাখ ১৭ হাজার রিয়াল, এখন ২৩ লাখ। যুদ্ধের আগে প্রতি কেজি শসার ছিল ৬ লাখ ৭০ হাজার, এখন সেটা ১০ লাখ ৫০ হাজার রিয়াল।

প্রতি কেজি চালের দাম ছিল ৫৩ লাখ, যুদ্ধ শুরুর পর তা হয়েছে ৫৪ লাখ রিয়াল। যুদ্ধের আগে এক লিটার রান্নার তেলের দাম ছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার, এখন সেটা ৬৮ লাখ। এক সময় ডিমের ডজন ছিল ২৮ লাখ, এখন তা ৬৪ লাখ রিয়াল। চিনির কেজি ছিল ৯ লাখ ২০ হাজার, এখন অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর পর সেটা ১১ লাখ ১৫ হাজার রিয়াল।

গরুর মাংসের কেজি ছিল ১ কোটি ৩৫ লাখ, এখন তা বেড়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ রিয়াল। যুদ্ধের আগে এক কেজি মুরগির মাংসের দাম ছিল ৪২ লাখ, এখন সেটা ৭৩ লাখ। বিভিন্ন ধরনের শিশু খাদ্যের কেজিপ্রতি দাম ছিল ৮২ লাখ, যুদ্ধ শুরুর পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কোটি ৬০ লাখ রিয়াল। যুদ্ধের আগে এক পাতা প্যারাসিটামলের দাম ছিল ১৪ লাখ, এখন সেটা ২৭ লাখ রিয়াল। ইনসুলিনের দাম ছিল ১২ লাখ, এখন তা ৮৯ লাখ। সাধারণ একটা শার্টের দাম ছিল ৪৫ লাখ, যুদ্ধের পর তার দাম এখন ৮০ লাখ রিয়াল।

তেহরানের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী আফসানেহ এক বছরের শিশুকে নিয়ে স্বামীসহ বসবাস করেন। তিনি বলেন, তাদের যা আয় সেটা দিয়ে যুদ্ধের আগে পরিবারের তিন বা ছয় মাসের বাজার হতো। কিন্তু এখন সেই আয় দিয়ে এক মাসই সংসার চালানো দায়।

আফসানেহ জানান, তাদের সাপ্তাহিক বাজারের খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে শিশুর দেখাশোনার ব্যয় থেকে। একটি ডে-কেয়ার কেন্দ্রে প্রতিদিন শিশুকে রাখার খরচ এখন প্রায় ৫ লাখ তোমান (৫০ লাখ রিয়াল বা প্রায় আড়াই ডলার), যা তাঁদের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রসঙ্গত, ইরানের সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন লেনদেনে ‘তোমান’ ব্যবহার করেন, যা ১০ রিয়ালের সমান। বড় অঙ্কের রিয়ালের হিসাব সহজ করতে এই এককটি বেশি প্রচলিত।

আফসানেহ বলেন, সরকার শিশু খাদ্যে ভর্তুকি দিলেও মাসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টি-সম্পূরক ওষুধ বিমার আওতায় নেই। ফলে সন্তানের মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নতুন কাপড় কেনা, গাড়ি বদলানো—এসব পরিকল্পনা বাদ দিয়েছি। এখন শুধু খাবার আর প্রয়োজনীয় খরচ চালিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য।’

আরো পড়ুন