ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লার লাকসাম, বরুড়া, মনোহরগঞ্জ, চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণ, মুরাদনগর, চান্দিনা, তিতাস, হোমনা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জমিদার বাড়ি। কোথাও বাড়ি গুলো ভেঙ্গে পড়ছে, ভবনের উপরে গজিয়েছে বট গাছ। কোথাও জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব ও বিলীন হয়ে গেছে। সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, কিছু জমিদার মানবসেবী ছিলেন, কিছু ছিলেন অত্যাচারী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য লাকসাম পশ্চিমগাওয়ের জমিদার নওয়াব ফয়জুন্নেছা। এ মহিলা জমিদার আজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করে স্মরণীয় হয়ে আছেন। বিপরীতে মনোহরগঞ্জের কমলপুরের জমিদার রাখাল রাজা ছিলেন অত্যাচারী ।

নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর নবাববাড়িঃ কুমিলা জেলার লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁওয়ের সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে ১৮৩৪ইং সালে নওয়াব ফয়জুন্নেসা জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাগুরু মৌলভী ওস্তাদ তাজউদ্দীন মিয়ার তত্ত্বাবধানে তিনি ঘরে বসে বাংলা, আরবী, ফার্সি ও সংস্কৃতি ভাষা চর্চা করেন। নওয়াব ফয়জুন্নেসার স্বামীর নাম ছিল গাজী চৌধুরী। স্বামীর বাড়ি বরুড়া উপজেলার বাউকসারে। তার দুই কন্যা সন্তান আরশাদুন্নেছা ও বদরুন্নেছা। নওয়াব ফয়জুন্নেসা ভারতবর্ষের একমাত্র মহিলা নবাব। তার আওতায় ১৪টি মৌজা ছিল যা দক্ষিণ কুমিল্লার অন্তর্গত বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গঠিত। ১৮৭৩ সালে কুমিল্লা শহরের নানুয়া দিঘীর পশ্চিম পাড়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন যা কালক্রমে শৈলরাণী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। ঐ বছরেই তিনি কুমিল্লার বাদুর তলায় ফয়জুন্নেসা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যা বর্তমানে নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নামে পরিচিত। তার জমিদারীর আওতায় ১৪টি কাচারী সংলগ্ন এলাকায় ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পশ্চিমগাঁয়ে তার বাড়ির পাশে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে ফয়জুন্নেছা এবং বদরুনেসা স্কুল নামে পরিচিত এবং একটি হাই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যা বর্তমানে নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজ নামে পরিচিত। নওয়াব ফয়জুন্নেছা ১৮৯৪ খ্রীষ্টাব্দে হজ্জ্ব পালন করতে গিয়ে মক্কায় মিসফাল্লা মহল্লায় একটি মুসাফিরখানা ও একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন, আবার মাদ্রাসা-ই সালাতিয়া ও ফুরকানিয়া মাদ্রাসার জন্য প্রতি মাসে তিনশত টাকা সাহায্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলমান নারী শিক্ষার অগ্রদূত নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরী শুধু নারী শিক্ষার কথা ভাবেননি তাদের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে এক দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। কুমিল্লা শহরে মেয়েদের জন্য তিনি পৃথক দুটি প্রাথমিক বালিকা স্থাপন করেন। মানবতার সেবায় ফয়জুন্নেসা কুমিল্লায় ফয়জুন্নেসা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে কুমিল্লা সদর হাসপাতালের ফয়জুন্নেসা নারী ও শিশু ওয়ার্ড নামে পরিচিত। ১৮৭৬ সালে ফয়জুন্নেসা রচিত সাহিত্য গ্রন্থ ‘রুপজালাল’ প্রকাশিত হয়। এছাড়া সঙ্গীত লহরী ও সঙ্গীতসার নামক দুইটি গীতিকাব্য রচনা করেছিলেন। জনসাধারণের উপকারার্থে ফয়জুন্নেসা প্রচুর দিঘি, পুকুর খনন করেছেন। পশ্চিম গাঁয়ে নিজ বাসস্থানের পাশে স্থাপন করেন একটি দশ গম্বুজ মসজিদ। নামাজীদের সুবিধার্থে একটি পুকুর খনন করেছিলেন। ১৯০১ সালে তার গ্রামে একটি অবৈতনিক মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেন। পশ্চিমগাঁয়ে ডাকাতিয়া নদীর উপর দিয়ে সামনীরপুল নামের একটি লোহার পুল রয়েছে যা তার মাতা আরফান্নেসা তৈরী করেছিলেন। সেই পুলটি ফয়জুন্নেসা পুনঃনির্মাণ করেন। সকলের চিকিৎসার জন্য নির্মাণ করেন ‘লাকসাম দাতব্য চিকিৎসালয়’। এ মহীয়সী নারীর মৃত্যু হয় ১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। নবাব ফয়েজুন্নেছা আর নেই, আছে তার স্মৃতি, যে স্মৃতি দেখতে এখনও বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন প্রচুর দর্শনাথী। কিন্তু নবাববাড়ির নবাব ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে আজ ধ্বংস ও বিলীন হওয়ার পথে। দীর্ঘ বছর থেকে এর সংস্কার নেই। নবাব ফয়জুন্নেছার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ওয়াকেফ দান করা। বর্তমানে প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে। নবাব বাড়ি ও সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য বংশানুসারে খাদেমের দায়িত্বে রয়েছে সৈয়দ মাসুদুল হক চৌধুরী এবং সৈয়দ কামরুল হক চৌধুরী। বাংলাদেশের গৌরব নারী মহীয়সী নবাব ফয়জুন্নেছার নবাববাড়ি সংস্কার করে সরকারিভাবে হেফাজতে নেয়া প্রয়োজন।

বেড়িয়ে আসুন লাকসামের দর্শনীয় স্থান ও জমিদারি রাজমহল

জমিদার রাখাল রাজার বাড়িঃ কুমিল্লার মনোহরগেঞ্জর হাসনাবাদ ইউনিয়নের কমলপুরের জমিদার রাখাল রাজার আন্দার মানিক বাড়িটি প্রায় ২’শ বছরের পুরাতন। সংস্কারের অভাবে ধ্বংস হচ্ছে এ বাড়িটি। ভূমি রেকর্ড পত্রানুযায়ী ১৭শ শতাব্দীর শেষ দিকে তৎকালীন জমিদার রাখাল রাজা এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। জমিদার রাখাল রাজার সৈন্যরা তাকে খুশি করার জন্য সুন্দরী রমণীদেরকে ধরে এনে তাকে উপঢৌকন হিসেবে দিতেন। শ্লীনতাহানির পর বহু মুসলিম নারীকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে জমিদারের বিরুদ্ধে। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক মুসলিম পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যায় অন্যত্রে।  অত্যচারের মাত্রা বেড়ে গেলে এক সময় বিভিন্ন এলাকার মুসলমানরা একত্রিত হয়ে রাখাল রাজার বিরুদ্ধে গড়ে তুলে আন্দোলন। এই আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি হিন্দু জমিদার রাখাল রাজা। পরাজিত হয়ে স্বপরিবারে পালিয়ে যায় এলাকা ছেড়ে। বাড়িটির ছাদের আস্তর খসে পড়ছে। দু’তলা উঠার সিঁড়ি ভেঙ্গে গেছে। কামরা গুলোর ভিতরে উই পোকার মাটিতে ভরে গেছে।

নবাব হোচ্ছাম হায়দার চৌধুরীর বাড়িঃ কুমিল্লা মহানগরীর দক্ষিণ চর্থায় অবস্থিত নবাব হোচ্ছাম হায়দার চৌধুরীর বাড়ি। এ জমিদার বাড়ির সদস্য জুলফিকার হায়দার জানান, নবাব হোচ্ছাম হায়দার চৌধুরী দানবীর জমিদার ছিলেন। কুমিল্লায় তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ মানুষের কল্যাণে অনেক দান করে যান। লাকসামের নওয়াব ফয়জুন্নেছা, বরুড়ার ভাউকসার জমিদার বাড়ি আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ বলে তিনি জানান।

ভৈরব চন্দ্র সিংহের জমিদার বাড়িঃ চান্দিনার মহিচাইলে অবস্থিত ভৈরব চন্দ্র সিংহের জমিদার বাড়ি। ২শ’ বছর পুরাতন বাড়িটি এখন ভেঙ্গে পড়ছে। ভৈরব চন্দ্রের নাতি ক্ষিতিশ চন্দ্র সিংহ (৯৫)। তিনি জানান, আমাদের জমিদারী ছিলো চান্দিনা, বরুড়া, দাউদকান্দি ও দেবিদ্বারে। ভৈরব চন্দ্র সিংহ প্রজা বান্ধব জমিদার ছিলেন বলে তিনি জানান। তাদের পূর্ব পুরুষের স্মৃতিচিহ্ন বাড়িটি রক্ষায় তিনি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

মজিদপুর জমিদার বাড়িঃ কুমিল্লার তিতাস উপজেলার মজিদপুর জমিদার বাড়িতে পাশাপাশি কয়েকটি ভবন রয়েছে। স্থানীয়দের থেকে জানা যায়, ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে লর্ড কর্ণওয়ালিস জায়গীরদারী প্রথাকে বিলুপ্ত করে জমিদারী প্রথা প্রচলন করেন। বৃহত্তর দাউদকান্দিতে মূলতঃ  কোন প্রভাবশালী জমিদার ছিল না। সোনারগাঁয়ের জমিদারদের অধীনেই পরিচালিত হত দাউদকান্দি পরগণা। তিতাসের মজিদপুরে জমিদার বাড়ির মোট ১৭টি অট্টালিকার মধ্যে ৪টি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। জমিদার বাড়ির আশেপাশে ১টি দীঘি এবং ছোট বড় মিলে ২০টি পুকুর রয়েছে। বর্তমানে তাদের কোন উত্তরাধিকারীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। পাকিস্তান সৃষ্টির পরই হিন্দু জমিদাররা তাদের সবকিছু  ফেলে ভারতে চলে যান। বর্তমানে সবগুলো ভবনই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবে ভবনগুলো বেশ কারুকার্য খচিত এবং বিভিন্ন খুপড়ির অস্তিত খুঁজে পাওয়া যায়। ভবনগুলোর মাঝে সুড়ঙ্গ পথও রয়েছে।   খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জমিদারী শাসনের শুরুর দিকে মজিদপুর জমিদার বাড়ির প্রথম পুরুষ শ্রী রামলোচন রায় মজিদপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। মেঘনা, তিতাস, হোমনা ও মুরাদনগর পর্যন্ত তাদের জমিদারী ছিল। শ্রী রামলোচন রায়ের তিন পুত্র শ্রী কালীচরন রায়, ব্রজেন্দ্র কুমার রায় এবং শিবচরন রায়। জমিদারী আইন বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত বংশ পরস্পরায় তাদের জমিদারী চলে। এখানের জমিদাররা খাজনা ও মহাজনী সুদের টাকা সময়মত পরিশোধ করতে না পারলে বন্ধকী সম্পত্তি জবর দখল করে নিত এবং নির্যাতন চালাতো। মুসলমানরা তাদের বাড়ির নিকট দিয়ে জুতা পায়ে এবং ছাতা মাথায় দিয়ে যেতে পারতো না।

জাহাপুর জমিদার বাড়িঃ মুরাদনগরে ৪০০ বছর আগের জাহাপুর জমিদার বাড়িটি এখনও আছে। এ বংশের ১২ তম বংশধর প্রফেসর অঞ্জন রায় বলেন, আমাদের বংশের উল্লেখযোগ্য বংশধর হচ্ছেন-বাবু রাজ চন্দ্র রায়, আনন্দ চন্দ্র রায় ও গিরীশ চন্দ্র রায়। গোমতী নদীর পাড়ে এই জাহাপুর। জমিদার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মুখোমুখি অবস্থানে দুটি সিংহ। বাড়ির প্রথম বিল্ডিংটি তিন তলা। পুরোটাই ইট-সুড়কি দিয়ে নির্মিত। এরকম আরও ৯টি বিল্ডিং ছিল। ২টি সম্পুর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রধান গেট দিয়ে প্রবেশ করেই একটি মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। এটি নাট মন্দির। এ বাড়িটির বয়স ৪ শ’ বছর হলেও তাদের জমিদারির বয়স দেড়শ বছর। জমিদারি লাভের পূর্বেই তারা প্রচুর অর্থ-সম্পদের মালিক ছিলেন। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাটের ব্যবসা করতেন। ১৮৬২ সালে এ বংশের লোকেরা জমিদারি লাভ করেন।

মুরাদনগরের থোল্লার জমিদার ছিলেন মীর আশরাফ আলী। তার জমিদারী বিস্তৃত ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা, বাকেরগঞ্জ, ও ময়মনসিংহ জেলায়। মুরাদনগরের আরেকটি জমিদার বাড়ি ভুবনঘর মিয়া বাড়ি। আওয়ামীলীগ নেতা ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন এ বংশের সন্তান। তাদের মধ্যে বিখ্যাত জমিদার ছিলেন আবদুস সোবহান আবদু মিয়া। এ বংশেরই সন্তান সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএকেএম সাদেক। তাদের জমিদারী মুরাদনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপৃত ছিল। মুরাদনগরের বাঙ্গরা জমিদার বাড়ি। এ বংশের প্রথম জমিদার ছিলেন উমালোচন মজুমদার। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বাঙ্গরা উমালোচন উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত শান্তিমনি হাসপাতাল তাদের অমর কীর্তি।

স্থানীয়দের অভিমত, কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি গুলো সংস্কারের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা গেলে তা হয়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র।