কুমিল্লার রাকিবুল এখন ইতালির ক্রিকেটার !

ইতালির জাতীয় ক্রিকেট দলের সঙ্গে বাংলাদেশের রাকিবুল হাসান (পেছনে বাঁ থেকে তৃতীয়)। ছবি: ফেসবুক

ডেস্ক রিপোর্টঃ রাকিবুল হাসান বাংলাদেশেরই ক্রিকেটার, ঢাকার ক্রিকেটে পরিচিত বাবু নামে। তবে ক্রিকইনফোতে তাঁর ক্লাবের নাম ভুলবশতই কলাবাগান ক্রীড়া চক্র লেখা হয়েছে। বাস্তবে কলাবাগানের হয়ে তিনি কখনোই খেলেননি। তবে তিনি কিন্তু একটি জাতীয় দলে খেলেন।

‘মেজর টিম: ইতালি, কলাবাগান ক্রীড়া চক্র।’
ক্রিকইনফো ওয়েবসাইটে কারও চোখ কোনোভাবে রাকিবুল হাসানের নামের ওপর পড়লে এই তথ্যে দৃষ্টি আটকে যেতে বাধ্য। ঢাকা লিগের ক্লাব কলাবাগান ক্রীড়া চক্রে কখনো ইতালির কোনো খেলোয়াড় এসে খেলে গেলেন নাকি!

ব্যাপারটা সে রকম নয় মোটেও। রাকিবুল হাসান বাংলাদেশেরই ক্রিকেটার, ঢাকার ক্রিকেটে পরিচিত বাবু নামে। তবে ক্রিকইনফোতে তাঁর ক্লাবের নাম ভুলবশতই কলাবাগান ক্রীড়া চক্র লেখা হয়েছে। বাস্তবে কলাবাগানের হয়ে তিনি কখনোই খেলেননি। ২০০৮-এ ইন্দিরা রোড ক্রীড়া চক্রের হয়ে ঢাকার ক্রিকেটে খেলা শুরু। সর্বশেষ ২০১০ সালে প্রথম বিভাগে খেলেছেন উত্তরা স্পোর্টিংয়ে। এরপর থেকেই রাকিবুল হয়ে যান ইতালির ক্রিকেটার। হ্যাঁ, ক্রিকইনফোর এই তথ্যটি সঠিক। গত দুই বছর ইতালি জাতীয় দলের সদস্য কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার ২২ বছর বয়সী এই তরুণ।

কুমিল্লা অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৮ দলের হয়ে একসময় বিসিবির বয়সভিত্তিক ক্যাম্পে সুযোগ পেয়েছিলেন রাকিবুল। কুমিল্লা জেলা দলের হয়ে খেলেছেন তিন বছর। দেশের ক্রিকেটে সম্ভাবনাময় শুরুর পরও মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর ইতালি পাড়ি দেওয়ার গল্পটা করুণ। ইতালির বোলোনিয়া থেকে রাকিবুলই মুঠোফোনে জানালেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে। কিছু আত্মীয়স্বজন ইতালি থাকতেন। তাঁরাই বললেন, এখানে চলে আসতে।’ ২০১১ সালে ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি জমান ইউরোপের দেশটিতে। পরের বছরই পেয়ে যান নাগরিকত্ব। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ইতালি গিয়েই কাজের সুযোগ পাননি। সে দেশের আইন অনুযায়ী একটি মানবাধিকার সংস্থার অভিভাবকত্বে কাটান দুই বছর। এই সময় তাঁর পড়াশোনা, থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব বহন করে ওই সংগঠন। এরপর যখন ‘বড়’ হলেন, মানে ১৮ বছরে পা দিলেন, রাকিবুল দাঁড়াতে শুরু করেন নিজের পায়ে।

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত রেস্তোরাঁতেই কাজ করছেন রাকিবুল। তবে ক্রিকেটের নেশাটা যায়নি, ‘রক্তে ক্রিকেট, তাই এখানে এসেও খেলাটাকে ভুলে থাকতে পারিনি। মানবাধিকার সংস্থায় থাকার সময়ও বন্ধুদের সঙ্গে টুকটাক খেলতাম।’ সেখান থেকে বের হয়ে খুঁজে পেলেন বোলোনিয়া স্থানীয় বাংলাদেশিদের একটা টুর্নামেন্ট। ওই টুর্নামেন্টে তাঁর খেলা দেখে পরিচিত একজন রাকিবুলকে নিয়ে যান স্থানীয় বোলোনিয়া ক্রিকেট ক্লাবে। এই ক্লাবের হয়েই ইতালির ঘরোয়া ক্রিকেট সিরি ‘আ’ লিগে খেলা শুরু। এরপর শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়া। বোলোনিয়া ক্রিকেট ক্লাব থেকে বছর দুই পরে নাম লেখান পিয়ানোরা ক্রিকেট ক্লাবে। গত বছর এই ক্লাব থেকেই ডাক পান ইতালি জাতীয় দলে।

ইতালির হয়ে রাকিবুল এখন পর্যন্ত দুটি টুর্নামেন্ট খেলেছেন। সর্বশেষ খেললেন ২ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইউরোপ অঞ্চলের বাছাইপর্বে, ইতালি যেখানে হয়েছে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। আগামী মার্চ-এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় চূড়ান্ত পর্বে শীর্ষ দুই দলের মধ্যে থাকলেই ২০২০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলবে রাকিবুলের ইতালি, হয়তো খেলবেন রাকিবুলও।

বাংলাদেশের রাকিবুল প্রথম ইতালির জার্সি গায়ে জড়ান গত বছরের আইসিসি ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ ডিভিশন ফাইভে। বল হাতে তেমন সাফল্য না পেলেও ওপেনিংয়ে নেমে পাঁচ ম্যাচের দুটিতেই করেছেন ফিফটি। বোলিংয়ে সাফল্য দেখলেন এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে। পাঁচ ম্যাচ ৮ উইকেট। বেলজিয়াম ও ফিনল্যান্ডের বিপক্ষে নিয়েছেন তিনটি করে। রাকিবুলের বাঁহাতি স্পিনটা যে ইউরোপের ব্যাটসম্যানদের কাছে একটু দুর্বোধ্যই, সেটির প্রমাণ এই দুই ম্যাচে তিনি রান দিয়েছেন ১৭ আর ১৩।

ইউরোপের বেশির ভাগ ক্রিকেট দল যে রকম হয়, ইতালির দলটাও অনেকটা সে রকম। উপমহাদেশের ক্রিকেটারদেরই ছড়াছড়ি। অবশ্য অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডপ্রবাসী পাঁচজন ইতালিয়ান ক্রিকেটারও আছেন দলটাতে। রাকিবুলসহ তাঁদের সবার একটাই স্বপ্ন-২০২০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলা। রাকিবুলের কণ্ঠ আবেগে বুজে এল এই লক্ষ্যের কথা বলতে গিয়ে, ‘আমরা চেষ্টা করছি ইতালির ক্রিকেটকে ওপরের দিকে নিয়ে যেতে। স্বপ্ন একটাই ইতালির হয়ে একদিন বিশ্বকাপে খেলা।’

কী বিস্ময়! জীবনসংগ্রামে অজানা দেশে পাড়ি জমানো কিশোর আজ তারুণ্যে এসে বিশ্বকাপে নাম লেখানোর স্বপ্নে বিভোর! বাংলাদেশের তারুণ্য আর ক্রিকেটের বিজ্ঞাপন হয়ে রাকিবুল মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন ইতালির নীল জার্সি গায়ে।

সূত্রঃ প্রথম আলো

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন:

ভালো লাগলে শেয়ার করুনঃ