ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লায় মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযান ও বন্দুকযুদ্ধ অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। মাদক ব্যবসায়ীরা এখনও সক্রিয়। গত একবছরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি’র মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায় অর্ধশতাধিক ‘বন্দুকযুদ্ধে’র ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩১ জন। পুলিশের দাবি, তারা সবাই শীর্ষ মাদক বিক্রেতা। তবে স্থানীয়রা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে যারা মারা যাচ্ছে, তারা সবাই খুচরা বিক্রেতা। কারণ, ৩১ জন নিহত হলেও জেলায় মাদকের আমদানি ও কেনাবেচা কমেনি, বরং মাদকের কারবার বেড়েই চলছে।

জানা যায়, কুমিল্লা জেলার ১৭টি উপজেলার মধ্যে সীমান্তবর্তী উপজেলা রয়েছে পাঁচটি। সীমান্ত দিয়ে মাদক আমদানি ও কেনাবেচার জন্য বেশি আলোচিত ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা। সীমান্তবর্তী এই উপজেলার একাধিক স্থানে মাদকের বেচাকেনা অনেকটা ওপেন-সিক্রেট। এছাড়া,সদর, বুড়িচং, সদর দক্ষিণ এবং চৌদ্দগ্রাম উপজেলাও মাদক কারবারের জন্য বেশ আলোচিত। এসব উপজেলার সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজিবি লাখ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য আটক করছে প্রতিদিন। আটক হচ্ছে কারবারিরাও। তবুও মাদকের সরবরাহ কমছে না বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৪ মে থেকে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই ঘোষণার পর কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুলিশসহ প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগ অভিযান শুরু করে। গত বছরের ৩০ মে থেকে এই বছরের ১৬ জুন পর্যন্ত পুলিশ, র‌্যাব এবং বিজিবির অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে ৩১ জন মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তবে বন্দুকযুদ্ধ নয় বরং মাদক নিয়ন্ত্রণে সীমান্তে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের দাবি জানিয়েছেন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমি একমত না। প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে সীমান্তে। গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) -এর কুমিল্লা জেলার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম বলেন,‘মাদক কেনাবেচা এবং মাদক কারবারের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যার আইনের কোনও ভিত্তি নেই। এটি কোনও স্থায়ী সমাধান নয়।’

নারী নেত্রী ও সাংবাদিক ইয়াসমিন রীমা বলেন,‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিচারহীন হত্যাকে সমর্থন না করলেও সহমত পোষণ করি। আগে দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচুক, পরে আইনকানুন।’

গণজাগরণ মঞ্চ কুমিল্লার মুখপাত্র খায়রুল আনাম রায়হান বলেন, ‘বন্দুকযুদ্ধ কোনও সমাধান নয়।এই হত্যাকাণ্ড মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য না। সমাধান করতে হলে মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। মাদকসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের কর্মশালার মাধ্যমে পরিবর্তন করতে হবে।’

এ ব্যাপারে কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘মাদক সেবন যেমন নেশা, মাদক ব্যবসাও তেমন। মাদক সেবনকারীরাই এই ব্যবসা করে থাকে। পুলিশসহ র‌্যাব,বিজিবি এবং মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে প্রতিদিনই মাদকদ্রব্য জব্দের পাশাপাশি আটক হচ্ছে ব্যবসায়ীরা। স্বাভাবিকভাবে পুলিশ তাদের মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠায়, এটাই সমাধান নয়। এছাড়া, সরকারের ঘোষণার পর অভিযানে জেলা পুলিশ এবং র‌্যাব-বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৩১ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। সমাজকে মাদকমুক্ত করতে হলে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিয়ে নিজের পরিবার থেকেই আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’