কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে স্থাপিত কভিড-১৯ ইউনিটে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও লক্ষণ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৩ দিনে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬১ জন। এর মধ্যে করোনার উপসর্গ (শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি ও কাশি) নিয়ে ৩১৩ জন এবং এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪৮ জন। সর্বশেষ গত ২৪ ঘন্টায় (রোববার সকাল থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত) হাসপাতালটিতে করোনার উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরো ১০ জন।

করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকা সময়ে গত ৩ জুন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হপাসাতালে ডেডিকেটেড করোনা ইউনিট (কভিড-১৯ ইউনিট) চালু করা হয়। করোনায় আক্রান্ত কিংবা এ ভাইরাসের উপসর্গ থাকা রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্থাপিত কভিড-১৯ ইউনিটে ১৮টি আইসিইউ শয্যাসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রতিদিনই ঘটছে একাধিক প্রাণহানি। ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে মৃতের তালিকা।

হাসপাতালের তথ্য বিভাগ থেকে জানা যায়, কুমিল্লা মেডিক্যালে ডেডিকেটেড কভিড-১৯ ইউনিট চালু হওয়ার পর গত ৭৩ দিনের মধ্যে শুধুমাত্র ২৭ জুলাই কোনো রোগী মারা যায়নি এখানে। বাকি ৭২ দিনে গড়ে প্রতিদিন ৫ জন করে রোগীর মৃত্যু হয়েছে এ হাসপাতালে। সবশেষ গত ২৪ ঘন্টায় ১০ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হাসপাতালটিতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৬১ জনে। এর মধ্যে জুন মাসে মারা গেছেন ১৪৪ জন, জুলাইয়ে ১৩৫ এবং চলতি মাসের প্রথম ১৭ দিনে প্রাণ হারিয়েছেন ৮২ জন। তাঁদের ২৬০ জন পুরুষ, ১০১ জন নারী।

কেনো এতো মৃত্যু কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে?
জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ও কুমিল্লার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘রোগীরা একেবারে শেষ মুহূর্তে, মুমূর্ষূ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হতে আসেন। কিন্তু এ অবস্থায় পৌঁছালে চিকিৎসকদের আর কিছুই করার থাকে না। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ রোগীরা যখন মুমূর্ষূ অবস্থায় আসেন- অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের বাঁচানো যায় না। তবে আমাদের চিকিৎসক-নার্সরা আন্তরিকতার সাথেই চিকিৎসা-সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’

হাসপাতালের তথ্যসূত্র বলছে, কুমিল্লা মেডিক্যালে করোনার সংক্রমণ-উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই ষাটোর্ধ্ব। গতকালও এ হাসপাতালে যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে ৬ জনের বয়সই ষাটের উপরে। আরো দু’ আছেন ৫০ ও ৫৫ বছর বয়সী। মারা যাওয়া বাকি দুজনের বয়স যথাক্রমে ৪০ ও ৩০ বছর।

একই কথা বললেন জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সমন্বয়ক ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘কুমিল্লায় করোনার সংক্রমণ-উসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দুই তৃতীয়াংশের বয়স ৫৫ উর্ধ্ব। অথচ জেলায় করোনায় আক্রান্তদের বেশির ভাগই তরুণ। তাদের বয়স ২০ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। শারীরিক সক্ষমতার (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) কারণে তরুণরা ধকলটা সয়ে নিতে পারলেও বয়োবৃদ্ধরা কাবু হয়ে পড়েন।’
‘স্বাস্থ্য বিধি না মেনে বাইরে ঘুরাফেরা করা তরুণদের কারণেই অধিকাংশ বৃদ্ধ আক্রান্ত হন’- উল্লেখ করে ডা. নিসর্গ বলেন, ‘রাস্তাঘাটে তরুণদের চলাচলই বেশি। তাদের অনেকেই অসেচতনভাবে এ ভাইরাসটিকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন ঘরে থাকা বয়োবৃদ্ধরা।’

জানতে চাইলে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোঃ আবুল ফজল মীর বলেন, ‘কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে। এজন্য জেলা প্রশাসন থেকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে। মাস্ক ব্যবহার না করাসহ স্বাস্থ্য বিধি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. নিয়াতুজ্জামান বলেন, ‘করোনার সংক্রমণ এখন কিছুটা কমতির দিকে। ঈদুল ফিতরের পর কুমিল্লায় করোনা রোগী কয়েকগুণ বাড়লেও ঈদুল আজহার পর সে অবস্থা হয়নি। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বাড়লেও জেলায় করোনার সংক্রমণ অনেক কমেছে।’

করোনার উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নমুনা পরীক্ষার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কুমিল্লায় এখন দুইটা পিসিআর ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। পরীক্ষা করাতে হবে, চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। না হলেও সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকানো যাবে না।’

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: