কুরবানীর ঈদ সমাগত। জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ ইংরেজী আগষ্ট মাসের ১২ তারিখ এবারের পবিত্র ঈদুল আযহা পালিত হবে।। মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হচেছ কুরবানী দেয়া। মহান রব হযরত ইব্রাহীম আঃ কে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসের বিনিময়ে। প্রিয় নবী সেই কঠিন পরীক্ষায় সহজেই উর্ত্তীণ হয়েছিলেন। তখন থেকে পশু কুরবানীর প্রচলন।

পশু কুরবানীর মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে এই শিক্ষা দিতে চেয়েছেন যে, আমরা যেন আমাদের অন্তর থেকে প্রতিহিংসা,বিদ্বেষ,জিঘাংসা,বিকৃত মনোবৃত্তি, পাশবিক আচরণ এসব কিছুকে দুর করে আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ,পবিত্র করে তুলতে পারি। পশু জবাই করার সাথে সাথে মনের পশুকেও জবাই করতে পারি। কুরবানীর এই শিক্ষা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আরো বেশী অনুভূত হচ্ছে। বিবাদ,বিদ্বেষ,হানাহানি দিনদিন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মধ্যযুগীয় বর্বরতা এখনও আমাদেরকে গ্রাস করে রেখেছে। বিবেক-বুদ্ধি আমাদের নির্বাসিত,চিন্তাশক্তি মৃতপ্রায়।

সমাজে নানারকম অপরাধ আগেও ছিল, এখন তা মহামারীর আকার ধারণ করেছে। কিন্তু এমনতো হওয়ার কথা নয়।মানুষের আয় বেড়েছে, জীবনযাত্রার মান বেড়েছে।শিক্ষা,স্বাস্থ্য, যোগাযোগ,প্রযুক্তি সর্বক্ষেত্রেই ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে।এসব উন্নয়নের সাথে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি,সচেতনতা,আচার-আচরণের ধনাত্মক পরিবর্তন হওয়ার কথা। মানবিক মূল্যবোধ,মুক্তিযুদ্ধের চেতনা,দেশপ্রেম আরো সুগঠিত হওয়ার কথা।কিন্তু উল্টো চিত্র দেখছি।সাম্প্রতিক সময়ে বীভৎস ঘটনাবলী ঘটেই যাচ্ছে। নষ্ট সমাজের ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠছে। কেন এরকম হচ্ছে? মায়া-মমতা,শ্রদ্ধা-ভালবাসা,সম্মান-দায়িত্ববোধ কেন উধাও হয়ে যাচ্ছে? চাঁদে যাওয়ার ৫০ বছর পরও আমরা গুজবে বিশ^াস করে নির্মমভাবে পিটিয়ে কেন মানুষ খুন করছি? প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, আমরা নির্বিকার,নিস্তব্ধ হয়ে কেন চেয়ে থাকি? যার পেছনে নামাজ পড়ি তাঁকে বিশ^াস করা কেন কঠিন হয়ে পড়েছে? যিনি শিক্ষাগুরু তিনিই বা কেন এত বিকৃত রুচির অধিকারী? যে যেখানে আছে,সেখানে সে সবকিছু নিজের মত করে পেতে চাচ্ছে কেন? সবকিছু নিজের করে নিতে হবে কেন? তাহলে অন্যদের কি হবে? সমাজের কি হবে? অনেক আগে কবি আসাদ চৌধুরী লিখেছিলেন,“প্রশ্ন নেই,উত্তরে পাহাড়! জনপ্রিয় লেখক আনিসুল হকের মতে, এখন পরিস্থিতি এ রকম দাঁড়িয়েছে, হাজারো প্রশ্ন, উত্তর কই? সত্যিই কি উত্তর নেই? কুরবানীর মর্মকথা যদি অনুধাবন করতে পারি,তাহলে সহজেই উত্তর পেয়ে যাব।

লেখাটির শিরোনাম কুরবানীর স্মৃতি ও প্রসঙ্গ কথা।শুরুতে গুরুগম্ভীর বর্ণনা হলেও কুরবানীর মধুর স্মৃতিতে পরিপূর্ণ মনের আঙ্গিনা।ছোটবেলায় কুরবানীর মাহাত্ম্য বুঝার চেয়ে আনন্দই মুখ্য ছিল।বেশ উপভোগ করতাম শৈশবের কুরবানীর সময়গুলো। বড়দের সাথে হাঁটে যেতাম কুরবানীর গরু দেখতে। দুপুর থেকেই হাঁটে যাওয়ার প্রস্তুতি। তখন কয়েক মাইল পায়ে হেটেই বাজারে যেতে হতো। সারা মাঠ জুড়ে নানা রংয়ের ছোট-বড় গরুর সমাহার।বড় বড় গরুর শিং ও গলায় মালা পড়ানো। বড়রা ব্যস্ত গরুর দর-দাম নিয়ে। দর-দামে না হলে পরদিন অন্যবাজারে ছুটে যাওয়া। ২/৩ বাজার যাচাই করে গরু কেনা হতো।গরু কেনা হলে গরুর দঁড়ি ধরে হেঁটে হেঁটে বাড়ি নিয়ে আসতাম। মনের আনন্দে শরীরের ক্লান্তি ভুলে যেতাম।

ঈদের দিন সকাল সকাল নামাজ শেষে মসজিদের হুজুর প্রথমেই আমাদের বাড়ীতে আসতেন গরু কুরবানীর জন্য।গরু জবাই করার পর মাংস বানানো, বিলি-বন্টন, তারপর রান্নার আয়োজন। কে আগে রান্না করে খাওয়াবে তা নিয়ে শুরু হয়ে যেত প্রতিযোগিতা। বাড়ীর সবাই পরম তৃপ্তি সহকারে কুরবানীর মাংস ভোজনে মেতে উঠতো। এখন সবার সামর্থ্য বেড়েছে, কিন্তু আন্তরিকতা? ছোট বেলার সেই আন্তরিকতা আর খুজে পাইনা।
কুরবানীর ঈদের টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোর মধ্যে আজও সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে সিলেটের মীরগঞ্জ বাজারে কুশিয়ারা নদীর ঘাটের সেই বেঁদে নৌকার ঘটনা। ১৯৮৮ সাল। আমি তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র। কুরবানীর জন্য গরু কেনা হলো। সেবারই প্রথম বাবা আস্ত গরু কুরবানী দিলেন। ঈদের দিন পড়ন্ত দুপুরে বাবা আমাকে বললেন, নদীর ঘাটে যেতে পারবি? আমি কারণ না জেনেই বললাম, পারবো।তিনি আমার হাতে কুরবানীর মাংসের একটি প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, নদীর ঘাটে বেদেঁদের একটি নৌকা আছে,মাংসের প্যাকেটটি তাদেরকে দিয়ে আয়।আমি সানন্দে মাংসের ব্যাগ নিয়ে বাজারের শেষপ্রান্তে এসে নদীর ঘাটের দিকে তাকালাম। ঘাটে সত্যিই বেঁেদদের একটি বড় নৌকা বাঁধা আছে। নৌকার কাছে গিয়ে দেখি, নৌকার ভেতরে নারী-পুরুষ একসাথে বসে হুক্কায় টান দিচ্ছ্।ে আমাকে দেখে কিছুটা বিষ্ময়।আমি মাংসের প্যাকেটটি দেখিয়ে বললাম,আমার বাবা পাঠিয়েছেন,আপনাদের জন্য।তাঁদের চেহারায় পরিতৃপ্তির হাসি দেখতে পেলাম। সামান্য কাজ,কিন্তু পরিতৃপ্তি সীমাহীন।আমিও অভিভূত আমার বাবার এহেন মানবিক আচরণে।

লেখকঃ
মাছুম মিল্লাত মজুমদার
সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজ