কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের গোহারুয়া ২০ শয্যা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ১৫ বছরেও এলাকাবাসীর মাঝে স্বাস্থ্যসেবায় আলো ছড়াতে পারেনি। দীর্ঘদিন থেকে পরিত্যাক্ত থাকায় হাসপতালটির মুল ভবন এবং আবাসিক ভবনের দরজা নেই, জানালার গ্লাস ভাঙ্গাচুরা রয়েছে। সর্বত্র ময়লা-আর্বজনা জমে আছে। আবাসিক ভবনে মাদক সেবীদের এখন আড্ডাখানা। হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঝোঁপ-জঙ্গল, সবজির বাগান এবং একজন ভোবা, ছাগল পালসসহ আবাসন গড়েছেন। হাসপাতালের সামনে দু‘টি সম্পত্তি অবৈধ দখলদারেরা দখলে নিয়ে মাছ চাষ এবং কৃষি কাজের জন্য লিজ দিয়েছেন। সীমানা প্রাচীর না থাকায় হাসপাতালটি অরক্ষিত এবং উত্তর পাশের মাটি ভেঙ্গে একটি দিঘীতে হাসপতালটির জায়গা ভেঙ্গে পড়ছে। এছাড়া, হাসপাতালের লাইট, ফ্যান, এয়ারকন্ডিশন, ফ্রিজ, আলমিরা, চেয়ার, টেবিলসহ সব চুরি হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল তৎকালীন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আবদুল গফুর ভূঁইয়া নাঙ্গলকোটের প্রত্যন্ত এলাকা জোড্ডা ইউনিয়নের গোহারুয়া, নিশ্চিন্তপুর, মান্দ্রা, মানিকমুড়া, দামুরপাড়, পাশ^বর্তী মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়া, বিনয়ঘর, ভোগই ও নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার বিরাহিমপুর গ্রামের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক তৃণমূল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গোহারুয়া ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

জোট সরকারের শেষ দিকে ২০০৬ সালের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন শ্রম প্রতিমন্ত্রী আমান উল্ল্যা আমান হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। আবাসিক ভবন নির্মাণসহ আন্তঃবিভাগ ও বহিঃবিভাগের সুবিধা নিয়ে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের কিছুদিন পর হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৪ সালের শেষ দিকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দাবির মুখে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপির সার্বিক সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কে এম নাসিম এমপি হাসপাতালটিতে শুধুমাত্র বহিঃবিভাগে স্বাস্থ্যসেবা চালু করেন।

কিন্তু সীমানা প্রাচীর নির্মাণ না করে, মূল ভবনসহ আবাসিক ভবন সংস্কার না করে, বহিঃবিভাগ চালু থাকলেও কোন ওষুধ বরাদ্ধ না থাকা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন না থাকায় আন্তঃবিভাগ ও জরুরী বিভাগ চালু করা সম্ভব না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আবার স্থবির হয়ে পড়ে।
২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) মাতুয়ারা শারমীন দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া, মেডিকেল অফিসার আয়েশা আক্তার শেফাকে এখানে পদায়ন করা হলেও নিরাপত্তার অভাবে তার পরিবর্তে তার স্বামী ডাঃ মাহবুব হাসান নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। সিনিয়র ব্রাদার আজিজুর রহমান ও টিকেট ক্লার্ক লিপি আক্তারকে এখানে পদায়ন করা হলেও তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করেন। একমাত্র ওয়ার্ড বয় রাকিবুল হাসান হাসপাতালটি দেখভাল করছেন।

গত ১০ডিসেম্বর হাসপাতালটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, মূল ভবনের দরজা-জানালা নেই। বাথরুমের কমেড ভেঙ্গে পড়ে আছে। বিভিন্ন রুমে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। পরিত্যক্ত দ্বিতল বিশিষ্ট একটি আবাসিক ভবনের দরজা নেই, জানালার গ্লাস ভাঙ্গাচুরা, বাথরুমের কমেড ভেঙ্গে পড়ে আছে। বিভিন্ন রুমে ময়লা-আবর্জনার সাথে সিগারেটের টুকরা, প্যাকেট এবং প্লেয়িং কার্ড পড়ে থাকতে দেখা যায়।

অন্য একটি আবাসিক ভবনে গত প্রায় দেড় বছর থেকে এলাকার দরিদ্র ভোবা আবুল কাশেম আবাসন গড়েছেন। তিনি সবজির বাগান, পেঁপে ও নারকেল গাছ রোপণ করেছেন। তিনি আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় ২টি ছাগল পালনসহ নিজে বসবাস করেন। এছাড়া, গোহারুয়া গ্রামের দরিদ্র বয়োবৃদ্ধ রুহুল আমিন (৭২) হাসপাতালের উত্তর-পশ্চিম পাশে সবজির বাগান করেছেন। তিনি লাউ, বেগুন, মরিচ এবং পেঁপে গাছ লাগিয়েছেন। হাসপাতালের উত্তর পাশে সীমানা প্রাচীর না থাকায় প্রায় ৭ ফুট অংশ মাছ চাষের একটি দিঘীতে (বড় পুকুর) বিলীন হয়ে গেছে। হাসপাতালাতে ঢুকতে দু‘পাশের নিচু জমিতে গোহারুয়া গ্রামের জিয়াউল হক খান ও নুরুল হক দখলে নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে মাছ চাষ এবং কৃষি কাজের জন্য বন্ধক দিয়েছেন। জানা যায়, তারা সম্পত্তিগুলো প্রতিবছর ৩০ হাজার টাকা করে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে বন্ধক দিয়ে আয় করছেন।

হাসপাতালে সেবা নিতে আসা গোহারুয়া গ্রামের শেপালী বেগম জানান, ওয়ার্ড বয় রাকিবুল হাসানের কাছে ডাক্তার আসার খবর পেয়ে তার প্রসূতি পুত্রবধু তানজিলাকে গাইনী বিশেষজ্ঞ মাতুয়ারা শারমীনকে দেখাতে নিয়ে এসেছেন। একই গ্রামের ইয়াছিন (৪৫) জানান, তার মেয়ে সুরাইয়ার (২০মাস) সর্দি, কাশি হওয়ায় মেডিকেল অফিসার ডাঃ মাহবুব হাসানকে দেখাতে নিয়ে এসেছেন। এছাড়া একই গ্রামের উম্মে হানি (৩২) তার ছেলে আহম্মদ উল্ল্যাকে ( ২) জর ও কাশি নিয়ে ডাঃ মাহবুব হাসানকে দেখাতে আসেন। কিন্তু ডাক্তার না আসায় দু‘জন তাদের মেয়ে এবং ছেলেকে ডাক্তার না দেখিয়ে ফিরে যান।

গোহারুয়া গ্রামের সমাজকর্মী এনাম ভূঁইয়া বলেন, হাসপাতালের সীমান প্রাচীর না থাকায় মাদকসেবী ও জুয়াখোরদের আড্ডা খানায় পরিণত হয়েছে। আবাসিক ভবনগুলো পরিত্যাক্ত অবস্থায় রয়েছে। আবাসিক ভবনে যেখানে ডাক্তার ও নার্স থাকার কথা রয়েছে। সেখানে গরু, ছাগল বসবাস করছে। এছাড়া এলাকার কিশোর ছেলেরা হাসপাতালটিকে শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নিকট দাবি জানান, হাসপাতালটিতে ডাক্তার, নার্স নিয়োগ প্রদান, আবাসিক ভবনগুলো সংস্কার, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ এবং নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ দিয়ে এলাকার অবহেলিত তৃণমূল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানান।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ দেব দাস দেব জানান, বর্তমানে হাসপাতালটিতে বহিঃবিভাগ চালু থাকলেও কোন ওষুধ বরাদ্ধ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন না থাকায় আন্তঃবিভাগ ও জরুরী বিভাগ চালু সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালটির প্রধান সমস্যা হচ্ছে সীমানা প্রাচীর নেই। হাসপাতালটি একটি বিলের মধ্যে এবং দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত। ওই এলাকাটি আন্তঃজেলা ডাকাত দলের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় হাসপাতাল এলাকাটিতে নিরাপত্তার সংকট রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য কর্মচারীরা এখানে থাকতে চান না। হাসপাতালটির সীমানা প্রাচীর নির্মাণ এবং আবাসিক ভবন সংস্কার জরুরী হয়ে পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, হাসপাতালটির সীমানা প্রচীর নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চিঠি দেয়া হয়েছে। হাসপাতালটিতে ঢুকতে দু‘পাশের সম্পত্তি অবৈধ দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, সম্পত্তিগুলো আমাদের কিনা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। হাসাপাতালটিতে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য সেবা চালুর বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ইউটিউবে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন: