লাকসামে খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, নীরব প্রশাসন

ডেস্ক রিপোর্টঃ কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার উত্তরদা ইউনিয়নের মিডিয়াপাড়া-খিলপাড়া খালটির দৈর্ঘ্য সাত কিলোমিটার। এর কোথাও মাটি আর বালু দিয়ে ভরাট করে মুছে ফেলা হয়েছে খালটির অস্তিত্ব। কোথাও খালের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা। কেউ অর্ধেক, কেউ বা পুরো খালের ওপর তুলেছে বিশাল পাকা ভবন। খালে বাঁধ দিয়ে মাছের খামারও করা হয়েছে। এভাবেই সরকারি খালটির বেশির ভাগ দখল করে নিয়েছে এলাকার প্রভাবশালীরা। তবে খালে এমন সারি সারি স্থাপনা আর দখল দেখেও নীরব উপজেলা প্রশাসন।

অভিযোগ উঠেছে, সব দেখেও দখলকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইসমাইল হোসেন। উল্টো অভিযানের নামে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দিয়েছেন তিনি।

উত্তরদা ইউনিয়নের আতাকরা গ্রামের মিয়াজিবাড়ির মো. মীর হোসেন বলেন, ‘আমি সম্পত্তি পরিমাপকারী দিয়ে জায়গা মেপে বাড়ির পূর্ব পাশে ও খালের পশ্চিম পাশে ১০৩ ফুট লম্বা একটি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ শুরু করি। কাজটি প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর গত বুধবার সকালে আচমকা এসে প্রাচীরটি ভেঙে ফেলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার ইসমাইল হোসেন। আমি অন্যদের মতো খাল দখল না করে বাড়ি থেকে যাতায়াতের জন্য সরকারের কাছে একটি কালভার্ট নির্মাণের দাবি জানিয়েছি। সেটা না হওয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে স্ব-উদ্যোগে কালভার্ট নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলাম। সেটাও ভেঙে দিয়েছেন তিনি।’

মীর হোসেনের ছেলে ইমরান হোসেন সবুজ বলেন, ‘আমাদের কোনো নোটিশ না করে নির্মাণকাজে বাধা দিয়ে হুট করে এসে সেটা ভেঙে দিয়েছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার। আমার মামা বারবার তাঁকে অনুরোধ করেছেন একটু সময় দিতে। আমি এও বলেছি, যদি সীমানাপ্রাচীর খালের জমিতে পড়ে, সেটা নিজ দায়িত্বে অপসারণ করব। কিন্তু তিনি কোনো কথা শোনেননি।’

সবুজের মামা আতাকরা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন ফারুক অভিযোগ করে বলেন, ‘ওই বাড়ির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হলে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের শ্যালক মহব্বত আলী লোক পাঠিয়ে আমাদের কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। আমরা চাঁদা দিতে রাজি হইনি বলেই তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি কর্মকর্তাকে দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মহব্বত আলী। তিনি বলেন, ‘চাঁদা চাওয়া তো দূরের কথা, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। এসব কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। আমি এমন কোনো ঘটনায় কখনো জড়িত ছিলাম না।’

গত শুক্রবার গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খালটি গোবিন্দপুর ইউনিয়নের মিজিয়াপাড়া থেকে শুরু হয়ে উত্তরদা ইউনিয়নের খিলপাড়ায় গিয়ে ডাকাতিয়া নদীর একটি শাখার সঙ্গে মিশেছে। মিজিয়াপাড়া-খিলপাড়া খালের দৈর্ঘ্য প্রায় সাত কিলোমিটার। উত্তরদা ইউনিয়নের আতাকরা গ্রামের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকার ওপর দিয়ে গেছে খালটি। তবে খালটির বেশির ভাগ জায়গাই দখল হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি দখল হয়েছে আতাকরায়। আতাকরায় একটু পরপরই চোখে পড়ে খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা। এ এলাকায় খালটি সবচেয়ে বেশি দখল করেছেন উত্তরদা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মতিন। খালের বিশাল একটি অংশে মাছের খামার করেছেন তিনি। আরেক স্থানে নিচে একটি ড্রেন নির্মাণ করে পুরো খালের ওপর বিশাল ভবন বানিয়েছেন। গ্রামের অনেকেই খালের ওপর নির্মাণ করেছে কাঁচা রাস্তা, ভরাট করে বানিয়েছে সমতল ভূমি। এসব দখলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি স্থানীয় ভূমি বিভাগ।

এভাবে খাল দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আবদুল মতিন বলেন, ‘আমি বিল্ডিংয়ের নিচে বড় করে ড্রেন করে দিয়েছি পানি চলাচলের জন্য। ওই ড্রেন দিয়ে পানি চলাচলে কোনো সমস্যা হয় না। এটা খাল দখল নয়।’

লাকসাম উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমি সরকারি সার্ভেয়র দিয়ে মেপে তারপর অভিযান পরিচালনা করছি। পর্যায়ক্রমে খালের ওপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা আছে।’

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ